হামে শিশুমৃত্যুর সতর্কবার্ত

মার্চেই ২১ মৃত্যু; টিকা সংকট ও নজরদারির ঘাটতিতে বাড়ছে উদ্বেগ।
টুইট ডেস্ক: দেশে আবারও হামের প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। চলতি মার্চ মাসেই অন্তত ২১ শিশুর মৃত্যুর তথ্য মিলেছে, আর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে অন্তত সাত জেলায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানে ঘাটতি, সরবরাহ সংকট ও মাঠপর্যায়ের দুর্বল নজরদারিই পরিস্থিতিকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজধানীসহ ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরে হামের প্রকোপ বেশি।
পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভোলা, পটুয়াখালী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেও আক্রান্ত শিশুদের ঢাকায় চিকিৎসা নিতে আসতে হচ্ছে। এতে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে রোগীর চাপ ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড়
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা গেছে, ১০০ শয্যার বিপরীতে হাম ও সন্দেহভাজন রোগী ভর্তি রয়েছে ১১৭ জন।
দ্বিতীয় তলায় হামের জন্য নির্ধারিত মাত্র আটটি শয্যা থাকলেও বাস্তবে রোগীদের বারান্দা ও মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৪৫০ জন হাম-সন্দেহে ভর্তি হয়েছে, যার প্রায় ৭০ শতাংশের শরীরে রোগটি শনাক্ত হয়েছে। শুধু মার্চেই এই হাসপাতালে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
রাজশাহী–ময়মনসিংহে ভয়াবহ চিত্র
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ বছর ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে মারা গেছে আরও তিনজন।
ময়মনসিংহ মেডিকেলে গত ১১ দিনে ১০৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত সাম্প্রতিক পরীক্ষায় রাজশাহী বিভাগে ১৫৩ সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ৪৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে—যা সংক্রমণের বিস্তার কতটা দ্রুত হচ্ছে, তারই ইঙ্গিত দেয়।
টিকা সংকটে বড় প্রশ্ন
হামের এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে টিকাদানের ঘাটতি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় গুদামে বর্তমানে হাম–রুবেলা টিকার মজুত শূন্য। ফলে কোথায় কতটুকু ঘাটতি আছে, তার পূর্ণ চিত্রও নেই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, আবার কোথাও টিকার সরবরাহই নেই।
সর্বশেষ জাতীয় টিকাদান অভিযান হয়েছিল ২০২০ সালে এরপর আর বড় কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি।
সংক্রমণের উৎস ও বিস্তার
দাতা সংস্থার একটি সূত্র জানায়, চলতি বছরের শুরুতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
একই সময় রাজধানীর বস্তি এলাকাগুলোতেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় একজন আক্রান্ত থেকে ১৫–১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা দ্রুত বিস্তারের অন্যতম কারণ।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। টিকাদান জোরদার, সরবরাহ নিশ্চিত করা, মাঠপর্যায়ে নজরদারি বৃদ্ধি এবং গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা জরুরি।
একজন বিশেষজ্ঞের ভাষায়, “হাম নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ কিন্তু টিকাদানে ব্যর্থতা এটিকে আবারও প্রাণঘাতী করে তুলছে।”
করণীয় কী
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হামের প্রাথমিক লক্ষণ জ্বর, পরে মুখে র্যাশ এবং তা দ্রুত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতাও দেখা দেয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের সব মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,আর সেই প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো টিকা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত টিকার জোগান নিশ্চিত করে জরুরি ভিত্তিতে গণটিকাদান কর্মসূচি চালু না হলে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।






