অন্ধকার নামলেই সক্রিয় সীমান্ত সিন্ডিকেট

শেরপুর সীমান্তে মাদক ও চোরাচালানের গোপন করিডোর, ধরাছোঁয়ার বাইরে মূলহোতারা

টুইট ডেস্ক: দিনের আলো ফুরাতেই যেন বদলে যায় শেরপুর সীমান্তের বাস্তবতা। পাহাড়ি ঝিরিপথ, ঘন বনাঞ্চল আর দুর্গম সীমান্তকে ঘিরে রাতের আঁধারে সক্রিয় হয়ে ওঠে সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র। মাদক, বিদেশি প্রসাধনী, নিষিদ্ধ পণ্য ও বিলাসদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশে সীমান্তজুড়ে গড়ে উঠেছে অদৃশ্য করিডোর।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকা বর্তমানে চোরাচালানের অন্যতম সক্রিয় রুটে পরিণত হয়েছে। কাঁটাতারের ফাঁক, পাহাড়ি পথ ও জঙ্গলের আড়াল ব্যবহার করে রাতের অন্ধকার কিংবা ভোরের কুয়াশায় সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ঢুকছে অবৈধ পণ্য।

তথ্য অনুযায়ী, শেরপুর সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত এসব পণ্য প্রবেশ করছে। এর মধ্যে বিলপাড়, নকশি, রাংটিয়া, লোহার ব্রিজ, গোমড়া, সন্ধ্যাকুড়া, তাওয়াকুচা, কর্ণজোড়া, নাকুগাঁও ও পানিহাটা উল্লেখযোগ্য।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সীমান্তজুড়ে চোরাচালান কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে একাধিক সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। কসমেটিক্স চোরাচালানে নেতৃত্ব দিচ্ছে নাজিমুদ্দিন, সামী, আতিক ও মামুন নামের কয়েকজন। অন্যদিকে মাদক ও অন্যান্য অবৈধ পণ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জুয়েল, রাসেল ও লিটন কোচসহ একটি শক্তিশালী চক্র। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে।

চোরাচালানের প্রক্রিয়াও অত্যন্ত সুসংগঠিত। প্রথমে ভারতের সীমান্তবর্তী ঢালুর দোবাচিপাড়া ও বারাঙ্গাপাড়া এলাকায় পণ্য জড়ো করা হয়। পরে অস্থায়ী গুদামে সংরক্ষণ শেষে বস্তায় ভরে সীমান্তের নির্দিষ্ট পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে আনা হয়। এরপর জঙ্গলে লুকিয়ে রেখে ইজিবাইক, মোটরসাইকেলের সিট কিংবা স্কুলব্যাগের আড়ালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, এমনকি রাজধানীতেও পৌঁছে দেওয়া হয়।

ময়মনসিংহ সেক্টরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত অভিযানে প্রায় ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার চোরাচালান পণ্য ও মাদক জব্দ করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে ১১৪ জনকে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরা পড়ছে নিচু স্তরের বাহকরা, মূল নিয়ন্ত্রকরা থেকে যাচ্ছে আড়ালে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলাও ঝুঁকিপূর্ণ। পরিচয় প্রকাশ হলে হামলার আশঙ্কা থাকে বলেও জানিয়েছেন অনেক বাসিন্দা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঝিনাইগাতীর এক যুবক বলেন, “রাত নামলে পুরো এলাকা বদলে যায়। দূর থেকে মোটরসাইকেলের শব্দ, মানুষের চলাফেরা বোঝা যায়। অনেক কিছু চোখে পড়লেও নিরাপত্তার ভয়ে কেউ কিছু বলতে চায় না।”

নালিতাবাড়ীর পানিহাটা এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সীমান্ত অঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাব থাকায় দ্রুত অর্থ আয়ের লোভে অনেক তরুণ এসব কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তবে বড় সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রকরাই, যারা সাধারণত সামনে আসে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, নজরদারির সীমাবদ্ধতা এবং আন্তঃসীমান্ত সমন্বয়ের ঘাটতির সুযোগে এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।

শেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বলেন, সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান রোধে বিজিবি, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। একইসঙ্গে আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা ছাড়া এই নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা বলেন, সীমান্তবর্তী অনেক এলাকা পাহাড়ি ও বনাঞ্চল হওয়ায় সেগুলো চোরাকারবারিদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ রুটে পরিণত হয়েছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং বড় বড় চালান জব্দ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ময়মনসিংহ ৩৯ বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সীমান্তে ড্রোন, নাইট ভিশন ও ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে চোরাচালান, মাদক ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই-নিয়মিত অভিযান ও জব্দের পরও কেন অন্ধকার নামলেই সীমান্তে সক্রিয় হয়ে ওঠে একই সিন্ডিকেট?