জাহাজের নাম বদল, আলোচনার বাইরে চার নৌসেনার আত্মত্যাগ!

জাতীয় চার নেতার নাম ও ‘জয় বাংলা’ বাদ দিয়ে কোস্ট গার্ডের পাঁচ জাহাজের নতুন নামকরণ; যাঁদের নামে জাহাজ, তাঁদের আত্মত্যাগের ইতিহাস জানার আগ্রহ কতটা দেখিয়েছে গণমাধ্যম?

বদিউল আলম লিংকন: বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পাঁচটি জাহাজের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। নাম পরিবর্তনের তালিকায় একটি জাহাজের নাম ‘জয় বাংলা’ থেকে ‘অদম্য বাংলা’ করা হয়েছে। অন্য চারটি জাহাজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর চার সদস্যের নামে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত-৩ শাখা থেকে জারি করা চিঠিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। চিঠিতে নতুন নামগুলো অবিলম্বে কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নাম পরিবর্তনের তালিকা:

বিসিজিএস জয় বাংলা → বিসিজিএস অদম্য বাংলা, বিসিজিএস সৈয়দ নজরুল → বিসিজিএস ফিরোজ কবির, বিসিজিএস তাজউদ্দীন → বিসিজিএস নুরুল ইসলাম, বিসিজিএস মনসুর আলী → বিসিজিএস এম. হুমায়ুন কবির, বিসিজিএস কামরুজ্জামান → বিসিজিএস আশরাফ সিদ্দিকী!

এর মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে নিহত জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানের নামে থাকা চারটি জাহাজের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘জয় বাংলা’ নামটিও পরিবর্তিত হয়েছে।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে নাম পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

যাঁদের নামে নতুন নামকরণ, তাঁরা কারা?

জাহাজগুলোর নতুন নামের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর চার সদস্যের আত্মত্যাগের ইতিহাস। তাঁরা দেশের নিরাপত্তা, দায়িত্ব পালন এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের কারও মৃত্যু হয়েছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে, কেউ বঙ্গোপসাগরে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন, আবার কেউ সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন।

কঙ্গোতে জীবন দেন নুরুল ইসলাম

লিডিং সিম্যান (সিডি) এম. নুরুল ইসলাম ছিলেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ডুবুরি ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন মোনুতে (MONUC) বাংলাদেশ কন্টিনজেন্ট BANBAT-2-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।

২০০৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ইতুরি অঞ্চলে টহল চলাকালে মিলিশিয়াদের অতর্কিত হামলায় নিহত হন নুরুল ইসলাম। তাঁর আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ তাঁকে মরণোত্তর ‘দ্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক’ প্রদান করে।

বঙ্গোপসাগরের ঝড়ে নিখোঁজ ফিরোজ কবির

লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ফিরোজ কবির ছিলেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ বানৌজা শহীদ ফরিদের অধিনায়ক।

২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে জাহাজটি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জাহাজের সদস্যদের সহায়তা করতে গিয়ে বিশাল ঢেউয়ে ভেসে যান তিনি। পরে নৌবাহিনী ব্যাপক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করলেও তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

দায়িত্ব পালনকালে প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখেও সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর এই ঘটনা তাঁর আত্মত্যাগের স্মারক হয়ে রয়েছে।

আমিনবাজারে হত্যার শিকার হুমায়ুন কবির

সিনিয়র চিফ পেটি অফিসার এম. হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ছিলেন। প্রেষণে র‍্যাব-১১-এ উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।

২০০৭ সালের মার্চে সাভারের আমিনবাজার এলাকায় সাদা পোশাকে গোয়েন্দা দায়িত্ব পালনকালে র‍্যাবের আরেক সদস্যসহ অপহরণ ও হত্যার শিকার হন তিনি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেয়।

দক্ষিণ সুদানে প্রাণ দেন আশরাফ সিদ্দিকী

ইনস্ট্রাক্টর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম. আশরাফ সিদ্দিকী ছিলেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শিক্ষা শাখার কর্মকর্তা।

দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ইউএনমিসে (UNMISS) মিলিটারি লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০১৮ সালের ২৬ জুন ইয়েই শহরের কাছে জাতিসংঘের গাড়িবহরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় নিহত হন তিনি।

ঢাকা সেনানিবাসের চপার্স ডেনে জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। জাতিসংঘ তাঁকে মরণোত্তর ‘দ্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক’ প্রদান করে।

নাম পরিবর্তনের খবর, কিন্তু আড়ালে আত্মত্যাগের ইতিহাস

লক্ষ্য করার বিষয়, কোস্ট গার্ডের পাঁচটি জাহাজের নাম পরিবর্তনের খবর প্রকাশে বিভিন্ন গণমাধ্যম বেশ সক্রিয়। কিন্তু যাঁদের নামে চারটি জাহাজের নামকরণ করা হয়েছে, তাঁদের পরিচয়, দায়িত্ব পালন এবং আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে সেই আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে।

একটি জাহাজের নাম পরিবর্তন নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু সেই নামের সঙ্গে যদি জড়িয়ে থাকে একজন মানুষের আত্মত্যাগ, তাহলে তাঁর জীবনের ইতিহাসও সামনে আসা প্রয়োজন।

একইভাবে, জাতীয় চার নেতার নামে থাকা জাহাজগুলোর নাম পরিবর্তন এবং ‘জয় বাংলা’ নামের পরিবর্তনও নিছক নামের পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং রাষ্ট্রীয় স্মৃতির প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পেছনে কী যুক্তি কাজ করেছে, তা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোস্ট গার্ডের প্রস্তাবের ভিত্তি ও নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করা উচিত।

গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু কে কী সিদ্ধান্ত নিল, তা প্রকাশ করা নয়; কেন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কী এবং এর তাৎপর্য কী—সেসব প্রশ্নও অনুসন্ধান করা।

চার নৌসেনার আত্মত্যাগ যেমন যথাযথ সম্মানের দাবিদার!

নাম পরিবর্তনের খবরের আড়ালে ইতিহাস হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো—ইতিহাসের সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরা, প্রশ্ন করা এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো।

বদিউল আলম লিংকন
বিশেষ বিশ্লেষণ |