ঢাকায় বাড়ছে থানা-ফাঁড়ি

অপরাধ দমনে ডিএমপির নতুন পরিকল্পনা, নজরদারিতে আসছে পুরো নগরী।
টুইট ডেস্ক: রাজধানী ঢাকায় খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থানা-ফাঁড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও বিশেষ অভিযানের মতো বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
ইতিমধ্যে নতুন তিনটি থানা চালুর প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি আরও একটি থানা ও দুটি নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তুতিও চলছে।
ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা, নতুন আবাসন এলাকা এবং সীমান্তঘেঁষা অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে পুলিশি নজরদারি জোরদার করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন থানা চালু হলে টহল কার্যক্রম বাড়বে, অপরাধস্থলে দ্রুত পুলিশ পৌঁছানো সহজ হবে এবং নাগরিক সেবাও আরও কার্যকর হবে।
নতুন থানা কোথায়?
প্রস্তাবিত নতুন তিন থানার নাম হচ্ছে রায়েরবাজার, বসুন্ধরা ও দক্ষিণগাঁও। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর থানার একটি অংশ নিয়ে গঠন করা হবে রায়ের বাজার থানা।
খিলক্ষেত, বাড্ডা ও ভাটারা থানার অংশ নিয়ে হবে বসুন্ধরা থানা এবং সবুজবাগ ও খিলগাঁও থানার অংশ নিয়ে গঠিত হবে দক্ষিণগাঁও থানা।
এই তিনটি থানা চালু হলে ডিএমপিতে মোট থানার সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৩টিতে। প্রতিটি থানার জন্য ১১৯ জন করে জনবল চাওয়া হয়েছে। এতে থাকবেন পরিদর্শক, উপপরিদর্শক, সহকারী উপপরিদর্শক ও কনস্টেবল পর্যায়ের সদস্যরা।
একই সঙ্গে মোহাম্মদপুরের একটি অংশ নিয়ে “বছিলা থানা” গঠনের প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হচ্ছে। এছাড়া বাড্ডার বেরাইদ এবং গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় নতুন দুটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অপরাধপ্রবণ এলাকায় বাড়তি নজর
ডিএমপি কর্মকর্তাদের মতে, রায়েরবাজার, বছিলা, জেনেভা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা, খিলক্ষেত ও বসুন্ধরা এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ বেড়েছে। এসব এলাকায় নতুন আবাসন প্রকল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়ায় অপরাধের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তিন মাসে ঢাকা মহানগরে ৫৭টি হত্যা মামলা, ৭২টি দস্যুতা, ১৯টি ছিনতাই, ১১টি ডাকাতি ও ৪৩১টি চুরির মামলা হয়েছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে ৩৭৫টি।
সম্প্রতি রাজধানীতে কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছিনতাইয়ের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বিশেষ অভিযানে শত শত গ্রেপ্তার
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ১ মে থেকে রাজধানীতে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে ডিএমপি। এক সপ্তাহের অভিযানে ৮৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেছেন, “চাঁদাবাজ, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি ও অনলাইন জুয়া চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে। নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।”
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতে জোর
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ডিএমপি। পুরো ঢাকা শহরকে প্রায় ১১ হাজার সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় সাত শতাধিক ক্যামেরা বসানো হয়েছে। শুধু মোহাম্মদপুর এলাকাতেই বসানো হচ্ছে প্রায় ৭০০ সিসিটিভি ক্যামেরা।
গুলশান এলাকায় বাড়ির মালিকদের সংগঠন “গুলশান সোসাইটি” ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩০০ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। পুলিশ বলছে, যেখানে নজরদারি বেশি, সেখানে অপরাধ তুলনামূলক কম ঘটছে।
এ ছাড়া “হ্যালো ডিএমপি” অ্যাপ, নাগরিক তথ্যভান্ডার, হোটেল বোর্ডার ইনফরমেশন সিস্টেম এবং সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের কার্যক্রমও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত ও নজরদারি সহজ হবে বলে মনে করছে পুলিশ।
পূর্বাচলও আসছে ডিএমপির আওতায়
পূর্বাচল নতুন শহরকে ডিএমপির আওতায় আনতে ইতিমধ্যে সরকারি আদেশ জারি হয়েছে। সেখানে ৪টি থানা, ৬টি ফাঁড়ি ও ৪১টি পুলিশ বক্স স্থাপনের জন্য জনবল চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পুলিশ সদস্য প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে ডিএমপি।
কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও আছে?
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু থানা-ফাঁড়ি বাড়ালেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে দ্রুত সাড়া, জবাবদিহি, নিয়মিত টহল ও দুর্নীতিমুক্ত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে না পারলে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন আসবে না।
তবে ডিএমপি বলছে, নতুন থানা, বাড়তি জনবল, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও ধারাবাহিক অভিযানের সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো সম্ভব হবে।






