রেল-সড়কের অব্যবহৃত জমি পুনরুদ্ধারে সরকারের কঠোর অবস্থান

রেল-সড়কের হাজার হাজার একর জমি পুনরুদ্ধারে সরকারের কঠোর অবস্থান।
টুইট ডেস্ক: সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অধীনে থাকা বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত ও অবৈধ দখলে থাকা জমি ফেরত নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু। বিশেষ করে রেল ও সড়ক খাতের জমি চিহ্নিত করে পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে যাচ্ছে সরকার।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী জানান, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকা জমি রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এসব জমি জরিপের মাধ্যমে চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনঃব্যবহার বা পুনর্বণ্টন করা হবে। একই সঙ্গে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে জমি উদ্ধার করা হবে।
রেলের জমিতেই বড় অনিয়ম
তথ্য অনুযায়ী, শুধু রেল খাতেই প্রায় ৬২ হাজার একর জমির মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৫৫৪ একর অব্যবহৃত এবং প্রায় ৬ হাজার ৭৫৪ একর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। এছাড়া ১৪ হাজার একরের বেশি জমি ইজারা দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারের নতুন উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেজিস্ট্রেশন-নামজারি একীভূত করার উদ্যোগ
ভূমিমন্ত্রী জানান, জমি রেজিস্ট্রেশন ও নামজারি পৃথক থাকায় জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হয়। এই সমস্যা সমাধানে রেজিস্ট্রেশন বিভাগকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি কাজ শুরু করেছে।
ডিজিটাল জরিপে স্বচ্ছতা বাড়বে
ডিজিটাল জরিপ চালুর মাধ্যমে ভূমি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন মন্ত্রী। এতে প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত হবে এবং জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও জালিয়াতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। সরকার ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক জমি ক্রয়-বিক্রয় ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
কৃষিজমি রক্ষায় কঠোর আইন
মন্ত্রী কৃষিজমি সংরক্ষণকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে কৃষিজমি অকৃষি কাজে ব্যবহারের প্রবণতা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষিজমি সুরক্ষা আইন কার্যকর করা হয়েছে, যাতে ইচ্ছামতো জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা না যায়।
‘ভেকু’ দিয়ে জমি ধ্বংসে শঙ্কা
ভূমি ধ্বংসের নতুন ঝুঁকি হিসেবে ‘ভেকু’ বা আধুনিক খননযন্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, দ্রুত পুকুর খননের নামে কৃষিজমি নষ্ট করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পরিবেশ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুর্নীতি রোধে প্রযুক্তি ও জবাবদিহি
ভূমি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কলসেবা কেন্দ্র, অনলাইন সেবা এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। মাঠ প্রশাসনে জবাবদিহিতা বাড়াতে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংসদ সদস্যদেরও নিজ নিজ এলাকায় ভূমি ব্যবস্থাপনা তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগকে ভূমি খাতে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অব্যবহৃত জমি পুনরুদ্ধার এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু রাজস্বই বাড়বে না, বরং দুর্নীতি ও হয়রানি কমে জনসেবার মানও উন্নত হবে।
তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসনের দক্ষতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, এই তিনটি বিষয়ই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
সরকার যদি ধারাবাহিকভাবে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে পারে, তাহলে দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।






