৪০০ যুদ্ধজাহাজ ছাড়াল চীনের নৌবাহিনী, বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ

বিশ্বের সমুদ্রশক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের আভাস, চীনের তিন বিমানবাহী রণতরী; নির্মাণাধীন চতুর্থটি!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সামরিক শক্তি ও সমুদ্র আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নতুন মাইলফলক অর্জন করেছে চীন। দেশটির নৌবাহিনীর (পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি—পিএলএ নেভি) যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। জাহাজের সংখ্যার হিসাবে চীনের নৌবাহিনী এখন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর চেয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ বড়। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সামরিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (ডব্লিউএসজে)।

সোমবার (২ নভেম্বর) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের নৌবহরে বর্তমানে ৪০০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা প্রায় ২৯০। গত কয়েক বছরে দ্রুতগতিতে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ এবং সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ অবস্থানে পৌঁছেছে বেইজিং।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সাল থেকে চীন তার নৌবহরে ৭১টি বড় যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন যুক্ত করেছে। এর মধ্যে শুধু গত বছরই যুক্ত হয়েছে ১৯টি। আধুনিক ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজার, ফ্রিগেট, উভচর যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন নির্মাণের পাশাপাশি বিমানবাহী রণতরী বহর সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি।

বিমানবাহী রণতরীতে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র

যুদ্ধজাহাজের সংখ্যায় চীন এগিয়ে থাকলেও নৌ-সামরিক সক্ষমতার সব ক্ষেত্রে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যায়নি। বর্তমানে চীনের তিনটি বিমানবাহী রণতরী রয়েছে এবং চতুর্থটি নির্মাণাধীন। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নির্মাণাধীন রণতরীটি পারমাণবিক শক্তিচালিত হতে পারে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে ১১টি বিমানবাহী রণতরী। মোট নৌবহরের টনেজ বা জাহাজগুলোর সম্মিলিত ওজন ও আকারের হিসাবেও এখনো এগিয়ে রয়েছে ওয়াশিংটন। অর্থাৎ জাহাজের সংখ্যা বেশি হলেও চীনের প্রতিটি জাহাজের আকার ও সামগ্রিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ে পৌঁছেছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না।

জাহাজ নির্মাণশিল্পে চীনের বড় সুবিধা

চীনের নৌবাহিনীর দ্রুত সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান কারণ দেশটির শক্তিশালী জাহাজ নির্মাণশিল্প। বাণিজ্যিক জাহাজ উৎপাদনে চীন বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণ করে দেশটির শিপইয়ার্ডগুলো। একই শিল্প অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতা সামরিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণেও কাজে লাগানো হচ্ছে।

ডব্লিউএসজের প্রতিবেদনে সাংহাইয়ের কাছে চাংসিং দ্বীপের দুটি বড় শিপইয়ার্ডের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে একদিকে বিদেশি ক্রেতাদের জন্য গ্যাসবাহী জাহাজ ও বিশাল কনটেইনারবাহী জাহাজ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে একই শিল্পাঞ্চলে নির্মিত হচ্ছে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মে মাসে ধারণ করা স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সেখানে একই সময়ে দুটি উভচর যুদ্ধজাহাজ, দুটি ক্রুজার, তিনটি ডেস্ট্রয়ার ও দুটি ফ্রিগেট নির্মাণ অথবা রক্ষণাবেক্ষণের কাজে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এতে চীনের সামরিক জাহাজ নির্মাণের ব্যাপক সক্ষমতার চিত্র উঠে এসেছে।

এশিয়ার সমুদ্রপথে বাড়ছে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি

চীন শুধু যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা বাড়াচ্ছে না, বরং নিজস্ব উপকূলের বাইরেও নৌ-অভিযানের পরিধি বিস্তৃত করছে। ডব্লিউএসজের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও নৌপরিবহন রুটগুলোতে যেকোনো দিনে চীনের নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ প্রায় ১০০টি জাহাজ সক্রিয় থাকতে পারে।

পূর্ব চীন সাগর, দক্ষিণ চীন সাগর এবং হলুদ সাগরসহ গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক এলাকায় চীনের উপস্থিতি বাড়ছে। একই সঙ্গে উপকূলরক্ষী বাহিনী, সামুদ্রিক গবেষণা জাহাজ এবং মাছ ধরার নৌযানের কার্যক্রমও দেশটির সামুদ্রিক প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাত এবং এশিয়ার সমুদ্রাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি মোকাবিলার বিষয়টি চীনের নৌ-কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে জাপান থেকে তাইওয়ান হয়ে ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’ অঞ্চলে দুই দেশের সামরিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ ও পাল্টা প্রস্তুতি

চীনের দ্রুত নৌ-সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক আধিপত্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সমুদ্রপথে প্রভাব বিস্তার করে আসা যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজস্ব জাহাজ নির্মাণশিল্পের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং নৌবহর আধুনিকায়নের উদ্যোগে গুরুত্ব দিচ্ছে।

ডব্লিউএসজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণ খাতে ব্যয় দ্বিগুণ হলেও নৌবহরের আকার সেই অনুপাতে বাড়েনি। পুরোনো জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, নতুন ফ্রিগেট নির্মাণ এবং জাহাজ নির্মাণশিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দেশটিকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, যুদ্ধজাহাজের সংখ্যায় চীনের অগ্রগতি বিশ্ব সামুদ্রিক শক্তির প্রতিযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে মোট টনেজ, বিমানবাহী রণতরী এবং দীর্ঘদিনের সামরিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো শক্তিশালী। ফলে সমুদ্রশক্তির এই প্রতিযোগিতায় শুধু জাহাজের সংখ্যা নয়, প্রযুক্তি, অস্ত্রের সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ, রসদ সরবরাহ ও বৈশ্বিক উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ২ নভেম্বর ২০২৬; যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সামরিক তথ্য।