বেগম আখতারের ১০ গান,গজল, দাদ যে কণ্ঠ আজও শ্রোতাদের আবেগে ছুঁয়ে যায়।

গজল থেকে বাংলা গান,বহুমাত্রিক সংগীতজীবনের যে ১০টি গানে ধরা পড়ে ‘মল্লিকা-ই-গজল’-এর অনন্য শিল্পসত্তা।
গজলকে সাধারণ শ্রোতার আবেগের গভীরে পৌঁছে দেওয়া শিল্পীদের তালিকায় বেগম আখতারের নাম অনিবার্য। ১৯১৪ সালের ৭ অক্টোবর ভারতের ফৈজাবাদে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীকে সংগীতজগতে ‘মল্লিকা-ই-গজল’ নামে অভিহিত করা হয়। তবে তাঁর শিল্পীসত্তা কেবল গজলে সীমাবদ্ধ ছিল না; ঠুমরি, দাদরা, বাংলা গান এবং চলচ্চিত্রেও তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র ছাপ।
সংগীতজীবনের শুরুর দিকে কয়েকটি রেকর্ড তেমন সাড়া না পেলেও ‘দিওয়ানা বানানা হ্যায় তো দিওয়ানা বানা দে’ গানটি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির জিতেন্দ্রনাথ ঘোষের সহযোগিতা ও নিয়মিত সাধনায় ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠেন আখতারি বাঈ ফৈজাবাদী। পরবর্তী সময়ে তিনিই হয়ে ওঠেন বেগম আখতার।
খ্যাতির সূচনা যে গজলে
‘দিওয়ানা বানানা হ্যায় তো দিওয়ানা বানা দে’,বেহজাদ লখনভির লেখা এই গজল বেগম আখতারের প্রতিষ্ঠার অন্যতম মাইলফলক। গানটির সাফল্যের পর তাঁর কণ্ঠের আবেদন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
কলকাতার সঙ্গে তাঁর শিল্পীজীবনের সম্পর্কও ছিল গভীর। সংগীতানুষ্ঠান, রেকর্ড, মঞ্চ ও চলচ্চিত্র,বিভিন্ন মাধ্যমে নিজের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। ১৯৩৪ সালের বিহারের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় কলকাতার আলফ্রেড থিয়েটারে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও তাঁর গজল ও দাদরা শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল।
প্রেমের বেদনার গজল
‘অ্যায় মোহাব্বত তেরে আনজাম পে রোনা আয়া’ বেগম আখতারের সবচেয়ে পরিচিত গজলগুলোর একটি। শাকিল বদায়ুনির লেখা এই গানে প্রেমের পরিণতি, হারানোর বেদনা ও স্মৃতির ভার একসঙ্গে ধরা পড়ে।
তাঁর গায়কির বিশেষত্ব ছিল,গানকে তিনি কেবল পরিবেশন করতেন না, শ্রোতার ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ করে তুলতেন। সংগীতজ্ঞ রবিশঙ্করের স্মৃতিচারণাতেও উঠে এসেছে, বেগম আখতারের গান শুনে প্রত্যেক শ্রোতার মনে হতো শিল্পী যেন তাঁকেই উদ্দেশ করে গাইছেন।
দাদরায় অন্য এক বেগম আখতার
‘হামরি অটরিয়া পে আও সাঁওয়ারিয়া’ গানটি বেগম আখতারের গজলশিল্পী পরিচয়ের বাইরে আরেকটি দিক তুলে ধরে। এটি দাদরা ধারার গান। প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, মান-অভিমান ও বিচ্ছেদের দূরত্ব ঘোচানোর আবেদন গানটির মূল আবেগ।
তাঁর সংগীতশিক্ষার শুরু হয়েছিল সারেঙ্গিবাদক ওস্তাদ ইমদাদ খাঁর কাছে। পরে পাতিয়ালা ঘরানার ওস্তাদ আতা মোহাম্মদ খাঁর কাছে তালিম নেন। খেয়ালের পাশাপাশি ঠুমরি, দাদরা ও গজলের সাধনা তাঁর গায়কিকে করে তোলে বহুমাত্রিক।
বাংলা গানে জোছনার অভিমান
বাংলাভাষী শ্রোতাদের কাছে বেগম আখতারের বিশেষ পরিচয়ের একটি গান ‘জোছনা করেছে আড়ি’। রবি গুহ মজুমদারের কথা ও সুরের এই গানে জোছনাকে যেন অভিমানী এক চরিত্র হিসেবে হাজির করা হয়েছে।
বাংলা গানে বেগম আখতারের আগ্রহের পেছনে সংগীতজ্ঞ জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কলকাতা বেতারের জন্য তাঁর মাধ্যমে ঠুমরি ও দাদরা অঙ্গে বাংলা গান প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এসব গান রেকর্ডেও প্রকাশিত হয়।
তরুণ কবির লেখা, কিংবদন্তির কণ্ঠ
‘কুছ তো দুনিয়া কি ইনায়াত নে দিল তোড় দিয়া’
লিখেছিলেন সুদর্শন ফাকির। জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও পৃথিবীর আচরণ কীভাবে মানুষের হৃদয় ভেঙে দেয়, সেই অনুভূতি ফুটে উঠেছে এতে।
জলন্ধরের আকাশবাণী কেন্দ্রে বেগম আখতারের সঙ্গে ফাকিরের পরিচয় হয় বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণায় উল্লেখ রয়েছে। তরুণ কবির লেখা পছন্দ হওয়ায় বেগম আখতার তা নিজের কণ্ঠে ধারণ করেন। তাঁর গায়কিতে গানটি বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পায়।
বিশ্বাস হারানোর আশঙ্কা
‘মেরে হামনফস মেরে হামনওয়া’ গানে আপনজনের কাছে বিশ্বাসভঙ্গ না করার আকুতি রয়েছে। শাকিল বদায়ুনির লেখা এই গজলে প্রেমের পাশাপাশি বন্ধুত্ব ও আস্থার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গানটির প্রকাশিত সংস্করণে সুরকার হিসেবে খৈয়ামের নাম পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত একটি দীর্ঘ রেকর্ডে গানটি স্থান পেয়েছিল। বেগম আখতারের পরিণত বয়সের গায়কির স্বাক্ষরও এতে স্পষ্ট।
স্মৃতি কি দুজনেরই আছে?
মোমিন খাঁ মোমিনের লেখা ‘ওহ জো হাম মে তুম মে করার থা’ পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতি ও হারানো ঘনিষ্ঠতার কথা বলে। একজনের মনে থাকা প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসা ও অভিমান,অন্যজনের মনেও আছে কি না, সেই সংশয়ই গানের আবেগকে গভীর করেছে।
১৯৭৫ সালে প্রকাশিত একটি রেকর্ডেও গানটির উল্লেখ পাওয়া যায়। বেগম আখতারের মৃত্যুর পর প্রকাশিত সেই রেকর্ডে পুরোনো উর্দু কবিতার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনাও ছিল।
গালিবের কবিতায় অপেক্ষা
মির্জা গালিবের লেখা ‘ইয়ে না থি হামারি কিসমত’ বেগম আখতারের কণ্ঠে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে। প্রিয়জনের সঙ্গে মিলিত হতে না পারার বেদনা, অপূর্ণতা ও দীর্ঘ অপেক্ষার অনুভূতি এতে ফুটে উঠেছে।
গালিবের কবিতা বেগম আখতারের সংগীতজীবনে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছিল। গালিবের মৃত্যুবার্ষিকীর শতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন এবং তাঁর গজলের দীর্ঘ রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল।
কোকিলকে থামতে বলা বাংলা গান
‘কোয়েলিয়া গান থামা এবার’ বেগম আখতারের বাংলা গানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। গানটির কথা ও সুর জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের।
বাংলা ভাষায় গান গাওয়ার ক্ষেত্রে কলকাতা বেতার ও জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের উদ্যোগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছেও বেগম আখতারের কণ্ঠ আলাদা আবেদন তৈরি করে।
মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকা আকুতি
‘ফিরায়ে দিয়ো না মোরে শূন্য হাতে’ বেগম আখতারের বাংলা গানের অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা এবং জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের সুরে গানটির কেন্দ্রে রয়েছে ফিরে না যাওয়ার আকুতি ও বঞ্চিত হওয়ার ভয়।
বাংলা গানের পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন বেগম আখতার। মেহবুব খানের ‘রোটি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’-এও তাঁকে দেখা গেছে।
১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর বেগম আখতারের মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে ধারণ করা গজল, দাদরা ও বাংলা গান আজও ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছে তাঁর শিল্পীসত্তার অন্যতম প্রধান পরিচয়। প্রেম, বিরহ, অভিমান, অপেক্ষা ও জীবনের নানা বেদনা,সবকিছুকে ব্যক্তিগত অনুভূতিতে রূপ দেওয়ার যে ক্ষমতা তাঁর গানে ছিল, সেটিই তাঁকে সংগীতের ইতিহাসে অনন্য করে রেখেছে।
তথ্যসূত্র: কালি ও কলম; ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় শিল্পকেন্দ্রের বেগম আখতার-সংক্রান্ত সংরক্ষণাগার।






