পাকিস্তান–বাংলাদেশ সম্পর্ক, বদলে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সমীকরণ: বিশেষ প্রতিবেদন

সা‌বেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শুরু ‘রিসেট’; নতুন প্রজন্ম, বাণিজ্য ও জনগণের যোগাযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

বি‌শেষ প্রতিবেদন, টুইটনিউজ২৪: পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দূরত্ব পেরিয়ে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নতুন আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরির সম্ভাবনাও দেখছেন বিশ্লেষকরা।

Washington Insights-এর ‘Why Are Pakistan & Bangladesh Getting Closer? | The New South Asia’ শীর্ষক ভিডিও আলোচনায় বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। আলোচনায় ছিলেন সঞ্চালক দুরে আকরাম, ইমরান শওকত এবং সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোউইচ।

আলোচকদের মতে, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় অভিন্ন সদস্যপদ থাকা সত্ত্বেও গত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্ক দুর্বল ছিল। এর পেছনে ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি এবং ভারতের সঙ্গে দুই দেশের জটিল সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের পাকিস্তান সফর, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন যোগাযোগ সম্পর্কের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে আলোচনায় বলা হয়।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ‘রিসেট’

জন ড্যানিলোউইচের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরই বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্কের নতুন রিসেট শুরু হয়। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কোনো একটি প্রতিবেশী দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেয়।

আলোচনায় বলা হয়, পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে নিয়ে আসে। এর ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আরও বহুমুখী যোগাযোগ ও অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হয় বলে আলোচকরা মনে করেন।

নতুন প্রজন্মই কি সম্পর্কের নতুন সেতু

আলোচনায় বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ইমরান শওকতের মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ১৯৭১ সালের পর জন্মগ্রহণ করেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত নয়। এই প্রজন্ম অতীতের সংঘাতের বাইরে ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক ও সহযোগিতার দিকে তাকাতে আগ্রহী।

তাঁর মতে, বর্তমানে ৩৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রজন্মই ধীরে ধীরে ব্যবসা, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নেতৃত্বের জায়গায় উঠে আসছে। দুই দেশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হলে তা ভবিষ্যতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও স্থায়ী ভিত্তি দিতে পারে বলে আলোচনায় মত দেওয়া হয়।

ঢাকা সফরের পর ইসলামাবাদে নতুন উদ্যোগ

ভিডিও আলোচনায় জন ড্যানিলোউইচ জানান, তিনি ইসলামাবাদে অবস্থান করছেন। মার্চ মাসে ঢাকায় সফরের পর বাংলাদেশ থেকে একটি বেসরকারি প্রতিনিধিদলকে পাকিস্তানে আমন্ত্রণ জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রতিনিধিদলে মিডিয়া, একাডেমিয়া, ব্যবসা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়। এর লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়—ডিজিটাল অবকাঠামো, উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানো। অর্থাৎ সম্পর্কের নতুন পর্যায়টি শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধ না রেখে বেসরকারি খাত, প্রযুক্তি, শিক্ষা, গণমাধ্যম ও নাগরিক পর্যায়েও বিস্তৃত করার চিন্তা রয়েছে।

ভারত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বাংলাদেশ

আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি ছিল—বাংলাদেশ কি ভারত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, নাকি কেবল নিজের কৌশলগত বিকল্প বাড়াচ্ছে?

আলোচকদের বিশ্লেষণে বিষয়টি সরাসরি ভারতবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখা হয়নি। বরং বাংলাদেশের জন্য একাধিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকল্প তৈরির প্রবণতার দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থানকে একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীলতার পরিবর্তে বহুমুখী কৌশলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

১৯৭১-এর উত্তরাধিকার কতটা প্রভাব ফেলছে

বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। ভিডিও আলোচনাতেও এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে আলোচকদের মতে, সময়ের সঙ্গে দুই দেশের জনসংখ্যাগত বাস্তবতা বদলেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, ব্যবসা, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে অতীতের জটিলতার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও আলোচনায় আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য কি বদলে দিতে পারে সম্পর্ক?

আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে সম্পর্কের অন্যতম সম্ভাব্য চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বাইরেও দুই দেশের মধ্যে স্বার্থের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

একইভাবে পাকিস্তান বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে কি না এবং বাংলাদেশ পাকিস্তানের বাজার ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কতটা কাজে লাগাতে পারে—সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

সার্ক ছাড়াই কি বদলাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া

আলোচনায় দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। বিশেষ করে সার্কের কার্যক্রম স্থবির থাকার মধ্যেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো দ্বিপক্ষীয় ও বিকল্প যোগাযোগের মাধ্যমে নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে পারে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, আঞ্চলিক সহযোগিতা কেবল প্রচলিত বহুপক্ষীয় কাঠামোর ওপর নির্ভর না করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বেসরকারি যোগাযোগ, ব্যবসা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমেও এগিয়ে যেতে পারে।

ভারতের জন্য এর অর্থ কী

বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্কের এই পরিবর্তন ভারতের জন্য কী অর্থ বহন করবে—এটিও আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বাংলাদেশ যদি একই সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ায়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচলিত কূটনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এই সম্পর্ককে এখনই কোনো স্থায়ী জোট বা নতুন শক্তি-অক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করার পরিবর্তে একটি চলমান কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্থায়ী রিসেট, নাকি সাময়িক পুনর্বিন্যাস

সবশেষে আলোচনার মূল প্রশ্ন থেকেই যায়—বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের এই পরিবর্তন কি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী রিসেট, নাকি সময় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে এমন একটি

কৌশলগত পুনর্বিন্যাস

ভিডিও আলোচনায় নতুন প্রজন্ম, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং পারস্পরিক উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বিনিময়কে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্ক এখন শুধু অতীতের ইতিহাস দিয়ে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে না; নতুন প্রজন্ম, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে একটি নতুন সম্পর্কের সম্ভাবনাও সামনে আসছে।

তবে এই রিসেট কতটা গভীর ও স্থায়ী হবে, সেটিই এখন দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

প্রতিবেদনের বক্তব্যের মূল উৎস: Washington Insights ইউটিউব আলোচনা—“Why Are Pakistan & Bangladesh Getting Closer? | The New South Asia”।
বক্তব্যদাতা: সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোউইচ ও ইমরান শওকত।
সঞ্চালনা: দুরে আকরাম।
বিশ্লেষণ: টুইটনিউজ২৪.কম।