মাছ নেই জালে, পেশা বদলাচ্ছেন শিবচরের জেলেরা

নিষিদ্ধ সূক্ষ্ম জালের ব্যবহারে কমছে দেশীয় মাছ, আয় কমে বিকল্প পেশায় ঝুঁকছেন অনেক জেলে

টুইট ডেস্ক: বর্ষায় নদী-খাল-বিলে পানি বাড়লেও আগের মতো মাছ মিলছে না মাদারীপুরের শিবচরের জেলেদের জালে। নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি, রিং ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারে দেশীয় মাছের মজুত কমে যাওয়ার পাশাপাশি জেলেদের জীবন-জীবিকায়ও পড়েছে প্রভাব। আয় কমে যাওয়ায় অনেক জেলে মাছ ধরার পাশাপাশি কৃষিকাজ ও দিনমজুরিতে যুক্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ পুরোপুরি পেশা বদলের কথাও ভাবছেন।

স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও বর্ষাকালে শিবচরের নদী, খাল ও বিলে শোল, গজার, বোয়াল, আইড়, টেংরা, পাবদা, কৈ, মাগুর, শিং, পুঁটি, বাইম ও বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়িসহ নানা ধরনের দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। নতুন পানি আসার পর জাল ফেললেই প্রচুর মাছ ধরা পড়ত। এখন পর্যাপ্ত পানি থাকলেও জালে আশানুরূপ মাছ পাওয়া যায় না।

স্থানীয় জেলেরা বলছেন, মাছ কমে যাওয়ায় তাদের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে সংসারের খরচ চালাতে মাছ ধরার পাশাপাশি কৃষিকাজ, দিনমজুরি ও অন্যান্য কাজে যুক্ত হতে হচ্ছে।

জেলে আলামিয়া বলেন, সারা দিন জাল ফেলেও আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। মাছ কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই মাছ ধরার পাশাপাশি অন্য কাজও করতে হচ্ছে।

আরেক জেলে পলাশ জানান, চায়না দুয়ারি জালে তুলনামূলক কম পরিশ্রমে বেশি মাছ পাওয়া যায় এবং দীর্ঘ সময় পানিতে রেখে দেওয়া যায়। এ কারণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেকে এ জাল ব্যবহার করছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শিবচরের বিভিন্ন নদী, খাল ও বিলে বর্ষার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহারও বেড়েছে। এসব জালের সূক্ষ্ম ফাঁসে বড় মাছের পাশাপাশি রেণু-পোনা, ডিমওয়ালা মা-মাছ, ব্যাঙ, পোকামাকড়সহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী আটকা পড়ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জলজ জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা এস এম দেলোয়ার বলেন, আগে বর্ষায় বাজারে দেশীয় মাছের অভাব ছিল না। এখন দেশীয় মাছ কিনতে গেলে দাম বেশি দিতে হয়, আবার অনেক মাছ পাওয়াই যায় না। নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশীয় মাছ হারিয়ে যেতে পারে।

ড. নুরুল আমিন ডিগ্রি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রভাষক রাজু আহমেদ বলেন, চায়না দুয়ারি, রিং ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহার জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য সংকট তৈরি করছে। এসব জালে মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন জলজ প্রাণীও মারা যাচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ও জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

দেশীয় মাছ রক্ষায় প্রজনন মৌসুমে কঠোর নজরদারি, মাছের অভয়াশ্রম বৃদ্ধি এবং নদী-খাল-বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, জেলে ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও জানান।

চায়না দুয়ারিসহ নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের অভিযান চললেও মাঠপর্যায়ে এসব জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। উপজেলার বিভিন্ন জলাশয়ে এখনো নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় সারা বছরই চায়না দুয়ারিসহ অন্যান্য নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চলছে।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু নিষিদ্ধ জাল জব্দ বা ধ্বংস করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এসব জালের বিক্রি বন্ধের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বারবার নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।