মিয়ানমারে শুরু, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানও সেখানেই: প্রধানমন্ত্রী

দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইলেন তারেক রহমান

টুইট ডেস্ক: রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে হওয়ায় এর স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারেই হতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে দেশের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে রাজধানীতে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখনো প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত রাজনৈতিক সমর্থন ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শুধু রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করলেই হবে না, এই সংকটের মূল কারণগুলোরও সমাধান করতে হবে। যে সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তার সমাপ্তিও হতে হবে মিয়ানমারেই।

বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থান সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতিকে বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে। জাহাজ চলাচল, মৎস্য, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এ অঞ্চলের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক এ অঞ্চলের অভিন্ন সমৃদ্ধির পথ আরও প্রশস্ত করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি সংলাপ, অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ।

সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতির ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, পানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও সর্বজনীন কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এর প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে পোশাক, স্কুলব্যাগ, মধ্যাহ্নভোজ ও বৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণের কথাও জানান তিনি।

তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা ও নতুন উদ্যোগকে সহায়তার মাধ্যমে তরুণদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তোলার কথা জানান তিনি।

কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও বাজারসংযোগ সহজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি শিল্প সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পানি নিরাপত্তায় আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগের কথাও বলেন তিনি।

পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার পাশাপাশি আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের সেবায় নিয়োজিত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার কথাও জানান তিনি।

শেষে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে পারস্পরিক সহযোগিতা, সুবিধা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির অঞ্চলে পরিণত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।