সৌদি আরব রক্ষায় ‘যেকোনো পর্যায়ে’ যাবে পাকিস্তান: ডিজি আইএসপিআর

সৌদির নিরাপত্তায় পাকিস্তানের অঙ্গীকার ‘শর্তহীন’, হুথি হামলার মধ্যে কঠোর বার্তা।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় পাকিস্তান ‘যেকোনো পর্যায়ে’ যেতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী।
১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম আরব নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের এই শীর্ষ সামরিক মুখপাত্র বলেন, সৌদি আরবের পাশে পাকিস্তান শুধু কূটনৈতিকভাবে নয়, শারীরিকভাবেও উপস্থিত রয়েছে। সৌদি নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুযায়ী পাকিস্তান সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তায় পাকিস্তানের অঙ্গীকার শর্তহীন। দুই দেশের জনগণ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে তিনি আবেগপূর্ণ, গভীর, ঐতিহাসিক ও অটুট বন্ধন হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, হারামাইন শরিফাইন ও সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তান প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, পাকিস্তান সৌদি আরবের পাশে রয়েছে এবং যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশটির নিরাপত্তা রক্ষায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
সৌদিতে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি
এই বক্তব্যের তাৎপর্য আরও বাড়িয়েছে সৌদি আরবে পাকিস্তানের চলমান সামরিক উপস্থিতি। রয়টার্সের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে আরব নিউজ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মে মাসে পাকিস্তান সৌদি আরবে প্রায় ৮ হাজার সেনা, একটি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন, ড্রোন এবং এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে। এসব সামরিক সরঞ্জাম পাকিস্তানি সদস্যরা পরিচালনা করছে এবং মোতায়েনের অর্থায়ন করছে সৌদি আরব।
তবে পাকিস্তানের এই সামরিক উপস্থিতির নির্দিষ্ট কার্যপরিধি এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত বাহিনী চাওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়ে ডিজি আইএসপিআর সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত জানাননি।
প্রতিরক্ষা চুক্তিতে নতুন মাত্রা
পাকিস্তান ও সৌদি আরব ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, দুই দেশের যেকোনো একটির ওপর আগ্রাসন উভয় দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হবে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চুক্তিটির লক্ষ্য দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এবং যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতা শক্তিশালী করা।
এরপর ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট মক্কায় পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। তিন দেশের চুক্তিতেও একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চুক্তিটিকে প্রতিরক্ষামূলক এবং আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারের উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
হুথি হামলার মধ্যে কঠোর বার্তা
ডিজি আইএসপিআরের বক্তব্য এসেছে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ধারাবাহিকতার মধ্যে। ১৭ সেপ্টেম্বর আরব নিউজও সৌদি ভূখণ্ডে হুথি হামলা এবং তায়েফে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষে হতাহতের খবর প্রকাশ করে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার এবং হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ এক বিষয় নয়। প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে ডিজি আইএসপিআর সৌদি নিরাপত্তায় পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথা বলেছেন, কিন্তু নতুন কোনো নির্দিষ্ট সামরিক অভিযান বা অতিরিক্ত বাহিনী পাঠানোর ঘোষণা দেননি।
আঞ্চলিক কূটনীতিতেও পাকিস্তানের ভূমিকা
সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি পাকিস্তান আঞ্চলিক সংকট নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মক্কা চুক্তিকে প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, এর উদ্দেশ্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে জোট গঠন নয়; বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিরোধ সক্ষমতা ও সহযোগিতা জোরদার করা।
ফলে ডিজি আইএসপিআরের সর্বশেষ বক্তব্যকে পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা সম্পর্কের আরও স্পষ্ট ও কঠোর রাজনৈতিক-সামরিক বার্তা হিসেবে দেখা যায়। বিশেষ করে দুই দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি, সৌদিতে পাকিস্তানি সামরিক উপস্থিতি এবং চলমান ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রেক্ষাপটে বক্তব্যটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে তাৎপর্যপূর্ণ।
সূত্র: আরব নিউজ, রয়টার্স ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।






