বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে অপচয় বন্ধে সংস্কারের আহ্বান, রাজশাহীতে নাগরিক সংলাপ

১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি ও তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধসহ ১২ দফা প্রস্তাব—উদ্যোগ বাস্তবায়নে বছরে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের দাবি।
মুরাদুল ইসলাম, রাজশাহী: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অস্বচ্ছ চুক্তি, অতিরিক্ত ব্যয় ও অদক্ষতা কমিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও আর্থিক চাপের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। তাই বিদ্যুৎ-জ্বালানি নীতির কেন্দ্রে জনস্বার্থ, জ্বালানি সুবিচার ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজশাহীর হোটেল ওয়ারিশানের সভাকক্ষে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) রাজশাহী জেলা আয়োজিত ‘ক্যাব প্রস্তাবিত ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নীতি ও জ্বালানি সুবিচার’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সংলাপে বক্তারা বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট এখন শুধু সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় ধরনের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। আবার উৎপাদন না করেও কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সক্ষমতার বিপরীতে অর্থ দিতে হচ্ছে। এর ফলে যে আর্থিক দায় তৈরি হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও ভোক্তাকেই বহন করতে হচ্ছে।
বক্তারা জানান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় কমানো এবং ভোক্তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে সরকারের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে ক্যাব। এ লক্ষ্যে সংগঠনটি ১২ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সরকারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেবা মুনাফামুক্ত করে বছরে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়, অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি বন্ধ, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানি দক্ষতা বাড়িয়ে বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ শতাংশ কমানো এবং তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছে ক্যাব। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বছরে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব।
বক্তারা বলেন, আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি ও ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই দেশীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁরা জ্বালানি খাতে অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ, জ্বালানি-সংক্রান্ত অনিয়ম ও অপরাধ নির্মূল এবং জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভোক্তা ও নাগরিকদের স্বার্থকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার আহ্বান জানান।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন ক্যাব রাজশাহী জেলা সভাপতি কাজী গিয়াস। সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাবের সমন্বয়কারী (গবেষণা) প্রকৌশলী এমএএম গোলাম কিবরিয়া।
এ সময় বক্তব্য দেন ক্যাবের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা প্রকৌশলী একেএম খাদেমুল ইসলাম ফিকসন ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক মারুফা কলি।
মুক্ত আলোচনায় বক্তব্য দেন ক্যাব রাজশাহীর উপদেষ্টা লিয়াকত আলী, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা কমিটির সফিউদ্দিন আহমেদ, ক্যাব রাজশাহীর সহসভাপতি মিজানুর রহমান, রাজশাহী স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সদস্য সচিব মাহফুজ হাসনাইন হিকল, ক্যাব নাটোরের সভাপতি সামিমা লাইজু ও সাধারণ সম্পাদক রইস উদ্দিন সরকার, ক্যাব সিরাজগঞ্জ জেলা সভাপতি শওকত আলী, ক্যাব নওগাঁ জেলা সভাপতি আজিজুল ইসলাম আজাদ এবং ক্যাব পবা উপজেলার সভাপতি কাজী নাজমুল ইসলাম।
পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন ক্যাব যুব সংসদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহসভাপতি এস আর বি ত্বমিন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ও ক্যাব সংসদের অরিত্র রোদ্দুর ধর।
সংলাপে বক্তারা বলেন, জ্বালানি খাতে টেকসই সংস্কার ছাড়া শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তাই অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে জনস্বার্থভিত্তিক জ্বালানি নীতি প্রণয়ন জরুরি।
তাঁদের মতে, আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।






