জরুরি বিল পরিশোধে ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ চালু করছে বাংলাদেশ ব্যাংক

৫০ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক ঋণসুবিধা, নগদে তোলা যাবে না।

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাময়িক অর্থসংকটে জরুরি বিল ও নির্ধারিত ফি পরিশোধের সুযোগ দিতে ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ নামে তাৎক্ষণিক ঋণসুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুবিধার আওতায় ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যাবে। ঋণের অর্থ নগদে তোলা, ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে জমা করা বা ডিজিটাল ওয়ালেটে স্থানান্তর করা যাবে না; সরাসরি নির্ধারিত সেবাদাতা বা বিল গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিশোধ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, জরুরি সেবার বিল, মুঠোফোন রিচার্জ, শিক্ষা ফি, চিকিৎসা ব্যয়, সঞ্চয়ের কিস্তি, বিমার প্রিমিয়াম, ভ্রমণ খরচ, কর ও সরকারি সেবার ফিসহ অনুমোদিত বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে এ ঋণ ব্যবহার করা যাবে। ব্যাংকগুলো চাইলে মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (এমএফএস), অর্থ পরিশোধ সেবাদাতা (পিএসপি), অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান (পিএসও) এবং অন্যান্য আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে এ সেবা দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে যুক্ত করতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযোজ্য নিয়ম ও নির্দেশনা মানতে হবে।

ঋণের মেয়াদ হবে ৭, ১৫ অথবা ৩০ দিন। সুদের পরিবর্তে গ্রাহককে নির্ধারিত মাশুল দিতে হবে। ঋণের পরিমাণ ও মেয়াদ অনুযায়ী সর্বোচ্চ মাশুল নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে ৭, ১৫ ও ৩০ দিনের জন্য সর্বোচ্চ মাশুল যথাক্রমে ৩, ৪ ও ৬ টাকা। ২৫১ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে মাশুল যথাক্রমে ৫, ৮ ও ১৫ টাকা। ৫০১ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের মাশুল ৭, ১২ ও ২০ টাকা। ১ হাজার ১ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের মাশুল ১০, ২০ ও ৩০ টাকা। ২ হাজার ১ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে মাশুল ১৫, ৩০ ও ৫০ টাকা।

৩ হাজার ১ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের মাশুল হবে ২০, ৪০ ও ৭০ টাকা। ৫ হাজার ১ টাকা থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের সর্বোচ্চ মাশুল ২৫, ৫০ ও ৯০ টাকা। আর ৭ হাজার ১ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে মাশুল হবে ৩৫, ৭০ ও ১৩০ টাকা।

ঋণের মূল টাকা ও মাশুল যথাক্রমে অষ্টম, ষোড়শ বা ৩১তম দিনে পুরোপুরি পরিশোধ করতে হবে। গ্রাহক চাইলে নির্ধারিত মেয়াদের আগেই মাশুলসহ ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন।

ঋণ পাবেন যেভাবে

কোনো গ্রাহক নিজের ব্যাংকের অ্যাপ থেকে নির্ধারিত বিল বা ফি পরিশোধের সময় পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’-এর প্রস্তাব পেতে পারেন। গ্রাহক সম্মতি দিলে অ্যাপেই ঋণের আবেদন করা যাবে। যে সেবার জন্য যত টাকা প্রয়োজন, শুধু সেই পরিমাণ অর্থই ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে।

ঋণের আবেদন থেকে শুরু করে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, সম্মতি গ্রহণ, বিল পরিশোধ এবং ঋণ আদায়—পুরো প্রক্রিয়াই ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। কাগজে স্বাক্ষরের পরিবর্তে গ্রাহককে ডিজিটালভাবে সম্মতি দিতে হবে। নিবন্ধিত মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করে পরিচয় যাচাই করা হবে। সম্মতি নেওয়ার আগে ঋণের পরিমাণ, মেয়াদ, মাশুল ও পরিশোধপদ্ধতিসহ গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো গ্রাহককে জানাতে হবে।

ব্যাংকগুলো নিজেদের অনুমোদিত নীতিমালার আওতায় বিকল্প ডিজিটাল স্কোরিং পদ্ধতিতে গ্রাহকের ঋণযোগ্যতা যাচাই করতে পারবে। ঝুঁকির ভিত্তিতে ঋণের সীমাও নির্ধারণ করা যাবে।

ছয় মাস পরীক্ষামূলক কার্যক্রম

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো প্রাথমিকভাবে ছয় মাস পরীক্ষামূলকভাবে এ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পাইলট পর্যায়ে সব ব্যাংক একসঙ্গে সেবা চালু নাও করতে পারে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরে নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গভাবে সেবা চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সাময়িক অর্থসংকটের কারণে অনেক গ্রাহক সময়মতো প্রয়োজনীয় বিল ও ফি পরিশোধ করতে পারেন না। এতে সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া, বিলম্বজনিত জরিমানা বা অন্যান্য সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এ সমস্যা মোকাবিলা এবং ডিজিটাল লেনদেনের দায়িত্বশীল ব্যবহার বাড়াতেই মাশুলভিত্তিক, তাৎক্ষণিক ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল এ ঋণসুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ সুবিধার মাধ্যমে জরুরি বিল পরিশোধে গ্রাহকের সাময়িক অর্থসংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশে ডিজিটাল ও ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে এটি ভূমিকা রাখবে।

বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক ইতিমধ্যে মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক ডিজিটাল ঋণ দিচ্ছে। এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অরূপ হায়দার বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ ও ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগে নতুন এ সেবা বড় প্রভাব ফেলবে। ঋণের অর্থ নগদে তোলা না যাওয়ায় তা নির্দিষ্ট সেবার বিল পরিশোধেই ব্যবহার হবে। ফলে মানুষের জরুরি ও মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনের পরিধিও বাড়বে।