অপারেশন জ্যাকপট ও রেডকিনের আত্মত্যাগে বাংলাদেশ-রাশিয়ার ঐতিহাসিক বন্ধন

অপারেশন জ্যাকপটের বীর নৌ কমান্ডো ও রুশ নাবিক রেডকিনকে ঢাকায় স্মরণ। মুক্তিযুদ্ধের নৌ অভিযানের বীরত্ব ও চট্টগ্রাম বন্দর মাইনমুক্ত করতে রুশ নাবিকের আত্মত্যাগ।
টুইট ডেস্ক: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সাহসী নৌ অভিযান ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর বীর নৌ কমান্ডো এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর মাইনমুক্ত করতে গিয়ে প্রাণ হারানো সোভিয়েত নাবিক ইউরি ভিক্টোরোভিচ রেডকিনকে স্মরণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ঢাকায় অবস্থিত রুশ হাউসে রাশিয়ার দূতাবাসের উদ্যোগে এ স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রুশ দূতাবাসের এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নৌ কমান্ডোদের অসামান্য সাহসিকতা এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর পুনরায় সচল করতে সোভিয়েত নৌবাহিনীর সদস্যদের অবদানের কথা স্মরণ করা হয়। বিশেষভাবে কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারানো তরুণ সোভিয়েত নাবিক ইউরি রেডকিনের আত্মত্যাগ তুলে ধরা হয়।
পাকিস্তানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় আঘাত
‘অপারেশন জ্যাকপট’ ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ অভিযান। ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট রাতে মুক্তিবাহিনীর নৌ কমান্ডোরা চট্টগ্রাম, মংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে সমন্বিত আক্রমণ চালান।
অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী একাধিক জাহাজে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে পাকিস্তানি বাহিনীর নৌপথে সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক প্রচার ও সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রেও এই অভিযান গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
চট্টগ্রাম বন্দর মাইনমুক্ত করতে সোভিয়েত অভিযান
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলো পুনরায় সচল করতে সোভিয়েত ইউনিয়ন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত নৌবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন অপসারণ এবং ডুবে থাকা জাহাজ উদ্ধারের কাজে অংশ নেয়।
প্রায় ৮০০ সোভিয়েত নাবিকের অংশগ্রহণে পরিচালিত ওই অভিযানে ২৬টি জাহাজ উদ্ধার করা হয় এবং বন্দর এলাকা মাইনমুক্ত করার কাজ করা হয়। এতে যুদ্ধের পর বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও নৌ যোগাযোগ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে।
এই অভিযানের সময় ১৯৭৩ সালের ১৩ জুলাই কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারান সিনিয়র নাবিক ইউরি ভিক্টোরোভিচ রেডকিন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর।
রেডকিনকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী একাডেমি এলাকায় সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। তাঁর সমাধিস্থলটি বর্তমানে ‘রেডকিন পয়েন্ট’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ নৌবাহিনী একাডেমির ক্যাডেটরা নিয়মিত তাঁর কবরের দেখভাল করেন।
যৌথ ইতিহাসের স্মৃতি ধরে রাখার উদ্যোগ
রুশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অপারেশন জ্যাকপটের বীরত্ব এবং ইউরি রেডকিনের আত্মত্যাগ স্মরণ করা বাংলাদেশ ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের প্রতিফলন। দুই দেশের অভিন্ন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেও এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ।
রুশ হাউসে আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠানটি দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়ার সহযোগিতার স্মৃতি ধরে রাখার পাশাপাশি বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যয়ও তুলে ধরে।







