আমের আঁটি থেকে নার্সারি, বছরে আয় ২০ লাখ টাকা

শিক্ষকতার পাশাপাশি এক একরের নার্সারিতে ৫০ হাজার চারা; নিজের হাতে শেখা কলম পদ্ধতিতে বদলে গেছে ম্রানুচিং মারমার জীবন।

টুইট প্রতিবেদক: করোনার সময় বিদ্যালয় বন্ধ। বেতনও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সংসার চালাতে শিশুদের পড়াতেন। সেই কাজও একসময় বন্ধ হয়ে যায়। তখন বাড়ির পাশে আমবাগান করার চিন্তা থেকে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে আমের আঁটি সংগ্রহ করে চারা উৎপাদন শুরু করেন ম্রানুচিং মারমা। সেই ছোট উদ্যোগই ধীরে ধীরে রূপ নেয় বড় নার্সারিতে।

খাগড়াছড়ির পানছড়ি সদরের কানুনগোপাড়ার বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সী ম্রানুচিং পেশায় একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি এখন এক একর জমিতে নার্সারি পরিচালনা করছেন।

সেখানে রয়েছে বিভিন্ন জাতের প্রায় ৫০ হাজার চারা। চলতি বছর এসব চারা বিক্রি করে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি।

২০২০ সালের মাঝামাঝি করোনার কারণে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে ম্রানুচিংয়ের নার্সারি করার আগ্রহ তৈরি হয়। বাজারে আমবাগানের চারা কিনতে গিয়ে দাম বেশি মনে

হওয়ায় নিজেই চারা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। পরিচিতজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে আমের আঁটি সংগ্রহ করে বাড়ির পাশে তা রোপণ শুরু করেন।

প্রথম দিকে তাঁর উদ্যোগ ছিল একেবারেই ছোট। ওই বছর প্রায় ১২ হাজার টাকার চারা বিক্রি করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে চারা উৎপাদনের কৌশল আয়ত্ত করেন। বিশেষ করে কলম পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন শিখে নেওয়ার পর তাঁর নার্সারির পরিসর ও পরিচিতি দুটিই বাড়তে থাকে।

বর্তমানে ম্রানুচিংয়ের নার্সারিতে আমের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের লিচু, পেয়ারা, লটকন ও বারোমাসি কাঁঠালের চারা রয়েছে। পাশাপাশি তিনি কলাবাগানও করেছেন। নার্সারির কাজে তাঁকে তিনজন শ্রমিক সহযোগিতা করেন।

সম্প্রতি নার্সারিতে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের ওপর সারি সারি আমের চারা। কোথাও ছোট চারা, কোথাও আবার কলম করা বড় চারা। শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে নিয়মিত এসব চারার পরিচর্যা করেন ম্রানুচিং।

জাতভেদে আমের চারা ৪০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করেন তিনি। নিজেদের জমিতে নার্সারি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে জৈব সার হিসেবে ব্যবহৃত গোবরও কম দামে পাওয়া যায়। ফলে ক্রেতাদের তুলনামূলক সুলভ দামে চারা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

শুধু স্থানীয় ক্রেতাই নন, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও মানুষ তাঁর নার্সারিতে চারা কিনতে আসেন। কেউ বাড়ির বাগানের জন্য, আবার কেউ বাণিজ্যিকভাবে আমবাগান করার পরিকল্পনা নিয়ে চারা সংগ্রহ করেন। অনেকেই চারা কেনার পাশাপাশি চাষাবাদ ও নার্সারি পরিচালনা বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নেন।

পানছড়ির উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রোমিতা দেওয়ানও ম্রানুচিংয়ের নার্সারি থেকে চারা কিনেছেন। তাঁর ভাষ্য, চার বছর আগে বিভিন্ন জাতের ১০০টি চারা কিনে লাগিয়েছিলেন। এ বছর সব গাছে আম ধরেছে এবং ফলের জাতও ভালো হয়েছে। নতুন জাতের আরও কিছু চারা নিতে তিনি আবার নার্সারিতে এসেছেন।

ম্রানুচিংয়ের চারা উৎপাদনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। শিক্ষক স্বামী উচিমং মারমার কাছ থেকে দেখে প্রাথমিকভাবে চারা তৈরির কাজ শেখেন। পরে নিজের অভিজ্ঞতা ও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ান।

প্রতিদিন সকালে নার্সারিতে গিয়ে কাজ করেন ম্রানুচিং। চারার পরিচর্যা শেষে বিদ্যালয়ে যান। স্কুল ছুটির পর আবার নার্সারিতে ফিরে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেন। ছুটির দিনগুলোও প্রায় পুরোটা নার্সারিতেই কাটে তাঁর।

ম্রানুচিং বলেন, ভালো চারা উৎপাদনের মূলমন্ত্র হলো নিজের হাতে কাজ করা। শুরুতে চারা রোপণ থেকে শুরু করে প্যাকেট করা পর্যন্ত সব কাজই নিজে করতেন। নার্সারি বড় হওয়ায় এখন শ্রমিকদের সহায়তা নিতে হয়। তবে কাজের মান ঠিক রাখতে তিনি নিজেই নিয়মিত সবকিছু তদারক করেন।

অনলাইনেও তাঁর নার্সারির চারা বিক্রি হচ্ছে। ‘গ্রিন কেয়ার নার্সারি’ নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পাতা রয়েছে তাঁর। সেখানে চারার ছবি ও তথ্য দেখে বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা যোগাযোগ করেন।

ম্রানুচিংয়ের স্বপ্ন এখন নার্সারিটিকে আরও বড় করা। নিজের সাফল্যের মাধ্যমে অন্য নারীদেরও কৃষি ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করতে চান তিনি।

পানছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুস সালাম বলেন, ম্রানুচিং মারমার চারা উৎপাদনের উদ্যোগের কথা তিনি শুনেছেন। এটি অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। কৃষি বিভাগের কাছে সহযোগিতা বা পরামর্শ চাইলে তাঁকে তা দেওয়া হবে। শিগগিরই তাঁর নার্সারি পরিদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

একসময় আমের আঁটি সংগ্রহ করে বাড়ির পাশে চারা লাগানো থেকে যে উদ্যোগের শুরু, কয়েক বছরের ব্যবধানে সেটিই এখন ম্রানুচিং মারমার আয়ের বড় উৎস।

শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক এই উদ্যোগ শুধু তাঁর নিজের আর্থিক স্বাবলম্বিতাই বাড়ায়নি, পাহাড়ি এলাকায় নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনাও সামনে এনেছে।