বাংলাদেশের স্যাটেলাইট রক্ষা পেল ধ্বংসাবশেষের ধাক্কা থেকে

ভারতের পুরোনো ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ মাত্র ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল; ঝুঁকি এড়াতে কক্ষপথ সামান্য পরিবর্তন করেন বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা।
টুইট ডেস্ক: মহাকাশে দ্রুতগতিতে ছুটে আসছিল ভারতের একটি পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ। সেটি সরাসরি এগিয়ে আসছিল বাংলাদেশের স্যাটেলাইটের দিকে। সংঘর্ষ হলে ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশযান বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১। শেষ মুহূর্তে কক্ষপথ সামান্য পরিবর্তন করে বড় ধরনের বিপদ থেকে স্যাটেলাইটটিকে রক্ষা করেছেন বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের
(বিএসসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান জানিয়েছেন, গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা থেকে সতর্কবার্তা আসে। এতে জানানো হয়, বাংলাদেশের স্যাটেলাইটের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে ভারতের পুরোনো ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ।
সতর্কবার্তা পাওয়ার পর গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত বিএসসিএলের ভূমি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে কর্মরত প্রকৌশলীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ, সংঘর্ষের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য হাতে সময় ছিল খুবই কম। পরবর্তী কয়েক দিন ধ্বংসাবশেষটির গতিপথ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ইনস্যাট-১এ ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। উৎক্ষেপণের কয়েক মাস পরই এতে সমস্যা দেখা দেয় এবং ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর স্যাটেলাইটটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। দীর্ঘদিন পর এর বিভিন্ন অংশের ধ্বংসাবশেষ মহাকাশে ঘুরতে ঘুরতে বাংলাদেশের স্যাটেলাইটের খুব কাছে চলে আসে।
সামান্য সরিয়ে রক্ষা
নাসার সতর্কবার্তার পর বিএসসিএলের প্রকৌশলীরা একদিকে ধ্বংসাবশেষটির গতিপথ পর্যবেক্ষণ করেন, অন্যদিকে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১-এর কক্ষপথ পরিবর্তনের সম্ভাবনা যাচাই করেন। কারণ, স্যাটেলাইটকে সরিয়ে নিলেই ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হবে—এমন নিশ্চয়তা ছিল না। নতুন অবস্থানে যাওয়ার পর অন্য কোনো বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হবে কি না, সেটিও হিসাব করতে হয়েছে।
১৩ আগস্ট প্রকৌশলীরা বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১-কে সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ধ্বংসাবশেষটি অতিক্রম করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার হওয়ার পর স্যাটেলাইটটিকে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে ধ্বংসাবশেষটি বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১-এর মাত্র ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো সংঘর্ষ হয়নি এবং স্যাটেলাইটটি বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই নিরাপদে রয়েছে।
মুহাম্মদ ইমাদুর রহমানের ভাষ্য, পুরো পরিস্থিতিতে প্রকৌশলীদের জন্য সময় ছিল সীমিত এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিতে হয়েছে। তাঁর মতে, ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকৌশলীদের এই সফলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
মহাকাশে বাড়ছে বর্জ্যের ঝুঁকি
মহাকাশে বর্তমানে শুধু সচল স্যাটেলাইটই ঘুরছে না। পুরোনো ও অকেজো স্যাটেলাইটের অংশ, নিয়ন্ত্রণ হারানো মহাকাশযানের বিভিন্ন খণ্ড এবং উৎক্ষেপণের পর পড়ে থাকা নানা বস্তু পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসবকেই মহাকাশের বর্জ্য বলা হয়।
এ ধরনের বস্তু অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলাচল করে। ফলে ছোট কোনো ধ্বংসাবশেষও সচল স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংঘর্ষে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। ২০০৯ সালে রাশিয়ার অকেজো কসমস-২২৫১ স্যাটেলাইটের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সচল ইরিডিয়াম-৩৩ স্যাটেলাইটের সংঘর্ষে দুটি স্যাটেলাইটই ধ্বংস হয়েছিল।
বাংলাদেশের স্যাটেলাইট-১-এর জন্য এমন ঝুঁকি এবারই প্রথম নয়। বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ ও ২০২৫ সালেও স্যাটেলাইটটির খুব কাছ দিয়ে মহাকাশের বিভিন্ন বস্তু চলে গিয়েছিল। ২০২১ সালে রাশিয়ার একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ এবং ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্যাটেলাইটকে ঘিরে ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
বাংলাদেশের মহাকাশ সক্ষমতার পরীক্ষা
২০১৮ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি মহাকাশকেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় বাংলাদেশের প্রথম নিজস্ব স্যাটেলাইট। শুরুতে এর নাম ছিল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১; জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ রাখা হয়।
প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি এই স্যাটেলাইটে রয়েছে ৪০টি সংকেত পরিবাহক। এর মধ্যে ২০টি বাংলাদেশের জন্য এবং বাকি ২০টি বিদেশে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এর সেবা ব্যবহার করে।
স্যাটেলাইটটি তৈরি করেছিল ফ্রান্সের থালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। ২০২১ সাল পর্যন্ত এর পরিচালনা ও তদারকিতে বিদেশি প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকলেও পরে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড নিজেই এর দায়িত্ব নেয়।
গাজীপুরের ভূমি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলী পালা করে ২৪ ঘণ্টা স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
মহাকাশবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো স্যাটেলাইটের খুব কাছ দিয়ে দ্রুতগতির বস্তু চলে গেলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করে সংঘর্ষ এড়ানো প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দক্ষতাসাপেক্ষ কাজ। বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা এবার সেই সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন।
মহাকাশে বাংলাদেশের উপস্থিতি যত বাড়বে, ততই এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১-কে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই শুধু একটি দুর্ঘটনা এড়ানোর ঘটনা নয়; এটি দেশের নিজস্ব মহাকাশ কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।






