কিশোরগঞ্জের গ্রামে পাঁচ শিশুকে বিক্রির অভিযোগ

দারিদ্র্য ও মাদকাসক্তির চাপে শিশু হাতবদলের অভিযোগ, তিন শিশুর হদিস নেই; প্রশাসন তদন্ত করছে।

টুইট প্রতিবেদক: কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে গত ছয় বছরে পাঁচ শিশুকে বাবা-মায়ের মাধ্যমে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এর মধ্যে চারটি ঘটনা ঘটেছে গত দুই বছরে। একই পরিবারের দুই শিশুকে নিয়েও এমন অভিযোগ রয়েছে।

তবে অভিযুক্ত দুই বাবা দাবি করেছেন, তাঁরা সন্তান বিক্রি করেননি; দত্তক দিয়েছেন এবং কোনো অর্থ লেনদেন হয়নি। এদিকে পাঁচ শিশুর মধ্যে অন্তত তিনজনের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তাদের পরিবারও নিশ্চিত নয়। সর্বশেষ একটি শিশুকে বিক্রির অভিযোগ থানায় লিখিত অভিযোগ পর্যন্ত গড়ালেও পরে অভিযোগটি প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিশু হাতবদলের অভিযোগগুলোর পেছনে দারিদ্র্য ও মাদকাসক্তির বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, গ্রামে মাদকাসক্তির বিস্তার বাড়ছে। তবে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, মাদকের পাশাপাশি দারিদ্র্য ও অসচেতনতাও এ ধরনের ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে।

নবজাতককে ঘিরে স্বামী-স্ত্রীর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
উত্তর চরপুক্ষিয়ার জাকির মিয়া ও ফারজানা বেগমের ঘরে গত ২ সেপ্টেম্বর একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। জাকিরের অভিযোগ, জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শিশুটিকে ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি ৬ সেপ্টেম্বর স্ত্রী, স্বজনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।

জাকিরের ভাষ্য, তিনি অটোরিকশা চালান এবং সন্তান জন্মের বিষয়টি জানলেও শিশুটিকে কোথায় নেওয়া হয়েছে, তা জানতে পারেননি। তাঁর দাবি, স্ত্রী তাঁকে বলেছেন শিশুটির বিনিময়ে ৬০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এখন শিশুটির অবস্থান সম্পর্কে তিনিও জানেন না।
অন্যদিকে ফারজানা অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, সন্তান তিনি বিক্রি করেননি; তাঁর স্বামীই শিশুটিকে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাঁর স্বামী মাদকাসক্ত।

ফলে স্বামী-স্ত্রীর বক্তব্য পরস্পরবিরোধী হলেও একটি বিষয়ে দুজনের বক্তব্যই একই,নবজাতকটির বর্তমান অবস্থান তাঁরা জানেন না। কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম গত ২৯ সেপ্টেম্বর জানিয়েছেন, জাকির মিয়া তাঁর অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন।

আরও কয়েকটি শিশুকে নিয়ে অভিযোগ
গ্রামের আরেক বাসিন্দা জাকির মিয়া, যিনি ‘বল জাকির’ নামে পরিচিত, তাঁর ও স্ত্রী ফেরদৌসী বেগমের তৃতীয় সন্তানকে প্রায় দুই বছর আগে অর্থের বিনিময়ে অন্যের কাছে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে জাকির দাবি করেছেন, সন্তানকে বিক্রি নয়, দত্তক দেওয়া হয়েছিল।

কার কাছে শিশুটিকে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। এমনকি দুই বছরে সন্তানের সঙ্গে দেখা হয়েছে কি না,এ নিয়েও তাঁর বক্তব্যে অসংগতি পাওয়া যায়।

সাদ্দাম হোসেন ও তাঁর তৃতীয় স্ত্রী সোহেনা বেগমের নবজাতক ছেলে আলহাতকে প্রায় ছয় মাস আগে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সাদ্দামের বিরুদ্ধে এর আগেও আরেক সন্তানকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সাদ্দামের মা নূর জাহান বেগম জানিয়েছেন, প্রায় ছয় মাস ধরে তাঁর ছেলে ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তিনি বলেন, বড় নাতনিকে দত্তক দেওয়া হয়েছিল এবং তার খোঁজ তিনি জানেন। তবে আলহাতকে দত্তক দেওয়া হলেও বর্তমানে তার অবস্থান সম্পর্কে তিনি জানেন না।

এ ছাড়া আসাদ ফকির ও তাঁর স্ত্রী সোমা আক্তারের সদ্যোজাত সন্তানকে প্রায় ১০ মাস আগে অন্যের কাছে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আসাদ দাবি করেছেন, প্রতিবেশী কুতুব মিয়ার মাধ্যমে শিশুটিকে আত্মীয়ের কাছে দত্তক দেওয়া হয়েছে এবং কোনো অর্থ লেনদেন হয়নি। কুতুবও দাবি করেছেন, তাঁর মেয়ে শিশুটিকে দত্তক নিয়েছে।

নেই জন্মনিবন্ধনের তথ্য
স্থানীয়ভাবে শিশু হাতবদলের এসব অভিযোগ থাকলেও কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী পাওয়া যায়নি। জাকির মিয়ার নবজাতক ছাড়া অন্য শিশুদের জন্ম বাড়িতেই হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব শিশুর কারও জন্মনিবন্ধনের তথ্যও পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কৃষিনির্ভর গ্রামটির অধিকাংশ পরিবার দরিদ্র। এর সঙ্গে মাদকাসক্তির সমস্যা যুক্ত হওয়ায় কিছু পরিবার আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ইয়াবা ও গাঁজার ব্যবহার বেড়েছে।

কটিয়াদী থানার কর্মকর্তারাও চরপুক্ষিয়ায় মাদকের সমস্যা থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান দিতে পারেননি। তাঁদের মতে, শিশু বিক্রি বা দত্তক দেওয়ার অভিযোগের পেছনে দারিদ্র্যও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

অভিযোগ খতিয়ে দেখছে প্রশাসন
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামিমা আফরোজ জানিয়েছেন, শিশু বিক্রির অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেছেন, অভিভাবকেরা আগ্রহী হলে পাঁচ শিশুকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সহযোগিতা করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে মা-বাবারও উদ্যোগ প্রয়োজন।

কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, চরপুক্ষিয়ায় মাদকের টাকার জন্য শিশু বিক্রির অভিযোগ তিনি শুনেছেন। তবে তাঁর মতে, দারিদ্র্য ও অসচেতনতাও শিশু বিক্রি বা দত্তক দেওয়ার মতো ঘটনার বড় কারণ।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রশাসনের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, উত্তর চরপুক্ষিয়ায় শিশুদের নিরাপত্তা ও পারিবারিক সুরক্ষার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, নিখোঁজ বা অবস্থান অজানা শিশুদের সন্ধান এবং তাদের আইনগত অবস্থান নির্ধারণের পাশাপাশি মাদকাসক্তি ও দারিদ্র্যের কারণগুলো মোকাবিলা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।