ফ্রান্সে জেনজি বিক্ষোভ, ক্ষোভের নেপথ্যে শিক্ষা সংকট

শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ও দীর্ঘ সময়ের ক্লাসের প্রতিবাদে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন; কয়েক শত মানুষ আটক।
টুইট প্রতিবেদক: ফ্রান্সজুড়ে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবন এবং দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ক্লাসসূচির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন রাজধানী প্যারিস ছাড়িয়ে বিভিন্ন শহরে পৌঁছেছে। কোথাও কোথাও বিদ্যালয় অবরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
ফরাসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৩ হাজার ৭০০ উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৪০০টিতে আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে। মঙ্গলবার দেশজুড়ে ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনোজ। আটক ব্যক্তিদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পরবর্তী সময়ে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়।
প্যারিসে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত লিল, বর্দো, রেন, নঁত, লিওঁ ও মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি স্থানে শিক্ষার্থীরা আবর্জনার পাত্রে আগুন দেয় এবং পুলিশের দিকে বোতল, পাথরসহ বিভিন্ন বস্তু ছোড়ে। পুলিশের পক্ষ থেকে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত ৪৮ সদস্য আহত হয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কারণ
ফ্রান্সের উচ্চবিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের প্রধান অভিযোগ শিক্ষা ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা নিয়ে। তাদের দাবি, অনেক শ্রেণিকক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে বিকল্প শিক্ষক পাওয়া যায় না। পাশাপাশি বেশ কিছু বিদ্যালয়ের ভবন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়।
গত জুনে তীব্র দাবদাহের সময় বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতা নতুন করে সামনে আসে। পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা না থাকায় গরমের মধ্যে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকট, বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ যুক্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সরকারের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। তাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের মৌলিক সমস্যা সমাধানের বদলে সরকার পোশাকসংক্রান্ত বিধিনিষেধসহ বিভিন্ন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সরকারি কর্মচারীদের ধর্মঘটের সঙ্গে যোগ
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময়ই ফ্রান্সে সরকারি কর্মচারীরা সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট কাটছাঁটের বিরুদ্ধে ধর্মঘট পালন করছেন। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি ইউরো ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকার ২০২৭ সাল পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে। এতে প্রায় ২০০ কোটি ইউরো সাশ্রয়ের কথা বলা হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, এর প্রভাব টানা চার বছর থাকতে পারে।
শিক্ষক সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অসন্তোষের পেছনে একই ধরনের সংকট কাজ করছে—অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জনবলসংকট এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ধর্মঘটে ১১ শতাংশের কিছু বেশি শিক্ষক ও কর্মচারী অংশ নিয়েছেন।
আন্দোলনে রাজনৈতিক উত্তাপ
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান ল্যাকোরনু বিদ্যালয়ের বাইরে সহিংসতার নিন্দা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষ কোনোভাবেই শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা পুলিশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার যৌক্তিক কারণ হতে পারে না।
অন্যদিকে বামপন্থী দল ‘ফ্রান্স আনবাউন্ড’-এর নেতা জঁ-লুক মেলাশঁ সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ওপর কঠোর দমননীতির অভিযোগ তুলেছেন। প্রধানমন্ত্রী সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, রাজনৈতিক স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে ব্যবহার করা উচিত নয়।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ফরাসি সরকার বিভক্ত সংসদে ২০২৭ সালের বাজেটের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতাও বাড়ছে।
শুধু শিক্ষাঙ্গনের সংকট নয়
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিক্ষোভকে শুধু বিদ্যালয়কেন্দ্রিক অসন্তোষ হিসেবে দেখলে এর বিস্তৃত প্রেক্ষাপট উপেক্ষিত হবে। সরকারি সেবার মান কমে যাওয়া, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার মতো বিষয়ও জনঅসন্তোষকে বাড়িয়ে তুলছে।
বিশ্লেষক ল্যাতুরের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন সংকটের কারণে ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই ধরনের অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, গত এক বছরে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সামনে আন্দোলনের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ফলে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভ এখন শুধু বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ বা অবকাঠামোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংকট, সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা এবং জীবনযাত্রার বাড়তি চাপ,
সব মিলিয়ে এটি দেশটির বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের একটি দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সামনে এসেছে।






