মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের পাশে তুরস্ক

হুথি হামলার মধ্যে সৌদির সামরিক চাহিদা পূরণে কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব আঙ্কারার

টুইট প্রতিবেদক: ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সৌদি আরবের সম্ভাব্য সামরিক চাহিদা পূরণে সহায়তার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে তুরস্ক। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, সৌদি আরবের প্রয়োজনীয়তা বিশেষ করে কারিগরি সামরিক ক্ষেত্রে হলে তা পূরণে আঙ্কারার আপত্তি নেই। পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় এ সহযোগিতা হতে পারে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) তুর্কি সম্প্রচারমাধ্যম এনটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, সৌদি আরবের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুতর হামলা হচ্ছে। তাদের সঙ্গে তুরস্কের একটি জোট চুক্তি রয়েছে এবং এ কারণে আঙ্কারা সৌদির পাশে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করছে। সৌদি আরবের কিছু সামরিক প্রয়োজন, বিশেষ করে কারিগরি বিষয়ে, থাকলে সেগুলো পূরণে তুরস্কের কোনো সমস্যা হবে না বলেও তিনি জানান।

মক্কা চুক্তি কী

সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আল-সাফা প্রাসাদে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় সম্মেলনে চুক্তিতে সই করেন।

চুক্তির মূল নীতি হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চুক্তিটিকে আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারের জন্য প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এর আগে এই পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারাকে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে কারিগরি দিক থেকে তুলনীয় বলে উল্লেখ করেছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটোর মতো সমন্বিত কমান্ড কাঠামো ও স্থায়ী যৌথ বাহিনী এখনো এই জোটের নেই। চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিও পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি।

৩১ আগস্ট ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’

৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে তিন দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর জোটটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ করা হয়। বৈঠকে রিয়াদে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং প্রথম মহাসচিব হিসেবে তিন বছরের জন্য পাকিস্তানের একজন প্রতিনিধিকে নিয়োগ দেওয়ার কথা জানানো হয়।

তুরস্ক জানিয়েছে, এই জোট কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে গঠিত নয়। এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। একই সঙ্গে অন্য দেশগুলোর অংশগ্রহণের জন্যও কাঠামোটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মক্কা চুক্তির আওতায় গঠিত কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির প্রথম বৈঠক ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

হুথি হামলার মধ্যে সৌদির নিরাপত্তা উদ্বেগ

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে জোটটি ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন করে তীব্র সংঘাতের মধ্যে। জুলাই থেকে হুথিদের হামলা বেড়েছে এবং সৌদি শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও লোহিত সাগরীয় নৌপথকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটছে। এর ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে ধোঁয়া ও আগুনের দৃশ্য দেখা যায়। হুথিরা সৌদি রাজধানীর ‘সংবেদনশীল’ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করে। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানায়, রিয়াদের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে এবং আরও কয়েকটি হামলার চেষ্টা নস্যাৎ করা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ওই ঘটনায় হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর নিশ্চিত করা হয়নি।

হুথিরা একই সময়ে ইয়ানবুর সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় হামলার দাবিও করেছে। এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের ঘটনা নিশ্চিত করেছে।

সৌদিকে সহায়তার বিষয়ে তুরস্কের বার্তা

এই পরিস্থিতিতেই হাকান ফিদান জানান, সৌদি আরবের সামরিক প্রয়োজন থাকলে তুরস্ক তা পূরণে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, বিশেষ করে কারিগরি বিষয়ে সৌদির প্রয়োজন থাকলে তা পূরণে আঙ্কারার আপত্তি নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ অবস্থান মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের পারস্পরিক সংহতির অংশ।

পাকিস্তানও চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী সৌদি আরবকে প্রয়োজন হলে ‘শারীরিকভাবেও’ রক্ষার কথা বলেছেন। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মক্কা চুক্তির আওতায় কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে না এবং প্রয়োজন দেখা দিলে পাকিস্তান পদক্ষেপ নেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

হাকান ফিদান একই সাক্ষাৎকারে বলেন, সৌদি আরবকে এমন কোনো সংঘাতে টেনে নেওয়া উচিত নয়, যেখানে দেশটি নিজে অংশ নিতে চায় না। তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে সৌদি আরবকে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন।

ফিদান জানান, সংঘাতের অবসানে বিভিন্ন পক্ষের কাছে নতুন কিছু প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে প্রস্তাবগুলোর বিস্তারিত তিনি প্রকাশ করেননি। তাঁর মতে, সংঘাতের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের উচিত আলোচনার উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা।

এদিকে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সহায়তা সীমিত রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বৃহত্তর মার্কিন সামরিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা তখন পর্যন্ত মূলত গোয়েন্দা সহযোগিতার মধ্যে সীমিত ছিল।

আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন সমীকরণ

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সম্পর্ককে একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামোয় এনেছে। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের ২০২৫ সালের কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ওপরও নতুন জোটটি দাঁড়িয়েছে।

তিন দেশের সামর্থ্যের দিক থেকেও জোটটির আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে—সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা এই কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এসব সক্ষমতা কীভাবে সমন্বিতভাবে ব্যবহৃত হবে, তা এখনো নির্ধারণাধীন।

চুক্তিটি কোনো বিদ্যমান আন্তর্জাতিক জোটকে প্রতিস্থাপন করে না এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়—এমন অবস্থান তিন দেশই তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এর সচিবালয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা কীভাবে বাস্তবে প্রয়োগ হবে, সে বিষয়ে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।

চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এর পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো গড়ে ওঠার পর্যায়ে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরবর্তী বৈঠকগুলোতে চুক্তির কার্যকর প্রক্রিয়া ও সহযোগিতার কাঠামো আরও সুসংহত করা হবে। ১৭ সেপ্টেম্বরের ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তুরস্ক চুক্তিটি সংসদে অনুমোদনের জন্য নেওয়ার কথা জানিয়েছে; পাকিস্তানে বিষয়টি সংসদে আলোচিত হচ্ছে কি না। জবাবে মন্ত্রণালয় চুক্তির পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠকের কথা জানায়।

ফলে চুক্তিকে এখনই ন্যাটোর সমতুল্য পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। এর রাজনৈতিক অঙ্গীকার স্পষ্ট হলেও সামরিক কমান্ড, স্থায়ী বাহিনী, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা কার্যকর করার বাস্তব কাঠামো এখনো বিকাশমান।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মক্কা জোটকে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ‘গেম-চেঞ্জিং’ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

সাম্প্রতিক হুথি হামলার মধ্যে সৌদি আরবের সামরিক প্রয়োজন পূরণে তুরস্কের কারিগরি সহায়তার প্রস্তুতির ঘোষণা তাই জোটটির বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

সূত্রসমূহ: Reuters, Bloomberg, Al Jazeera, Dawn, TRT World, Al-Monitor, Daily Sabah, NTV সাক্ষাৎকার।