মক্কা চুক্তির পরও ইসরায়েলের সহায়তা কেন চাইছে সৌদি?

হুথি হামলার চাপে গোয়েন্দা সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ; তুরস্ক-পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকলেও কেন জেরুজালেমের দিকে ঝুঁকছে সৌদি
টুইট ডেস্ক: ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার মুখে সৌদি আরব ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা সহায়তা নিচ্ছে বলে ইসরায়েলি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লোহিত সাগর ও আশপাশের অঞ্চলে হুথিদের তৎপরতা শনাক্ত এবং সম্ভাব্য হামলার তথ্য পেতে রিয়াদ ইসরায়েলের সহায়তা চেয়েছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সামরিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও আবেদন করেছেন। তবে সৌদি আরব বা ইসরায়েল—কোনো পক্ষই ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেনি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলোচ্য সহায়তা মূলত গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও হুমকি শনাক্তকেন্দ্রিক। ইসরায়েলের সরাসরি বিমান হামলা, সেনা মোতায়েন বা সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এটি সরাসরি সামরিক জোটের বদলে সীমিত নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয় বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
সৌদি আরবের এমন পদক্ষেপের পেছনে হুথিদের সাম্প্রতিক তৎপরতা বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। লোহিত সাগরের কৌশলগত পথ, সৌদি শহর, বিমানঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে হামলার ঝুঁকি বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১২ সেপ্টেম্বর হুথিরা পেরিম দ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর আগের দিন তাদের ড্রোন হামলায় সৌদির একটি পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন অচল হয়ে পড়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব শুধু ইসরায়েল নয়, ব্রিটেন, মিসর ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের কাছ থেকেও সহায়তা চেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং গোয়েন্দা সহায়তা বাড়ানোর জন্য সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন সরাসরি হামলায় জড়ানোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
সৌদি আরবের ইসরায়েলমুখী এই যোগাযোগের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির পর। ওই চুক্তিতে একটি দেশের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার নীতি রাখা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এমন চুক্তি থাকার পরও রিয়াদ কেন তুরস্ক বা পাকিস্তানের বদলে ইসরায়েলের কাছ থেকে সহযোগিতা চাইছে।
এর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে সক্ষমতার পার্থক্য। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা, নজরদারি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও আশপাশের সামুদ্রিক অঞ্চলে হুমকি শনাক্তকরণে ইসরায়েলের সক্ষমতাকে সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগাতে চাইতে পারে।
অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক থাকলেও ইরানকে ঘিরে তাদের অবস্থান ভিন্ন। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে এবং তুরস্কও ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে ইরান-সংশ্লিষ্ট সংঘাতে সরাসরি সামরিক ভূমিকা নেওয়া তাদের জন্য কূটনৈতিকভাবে জটিল হতে পারে।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। দেশটির ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রকাশ্য নিরাপত্তা সমন্বয় পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্ক তৈরি করতে পারে। ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে মক্কা চুক্তি থাকলেও ইসলামাবাদ সরাসরি ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট কোনো নিরাপত্তা উদ্যোগে প্রকাশ্যে যুক্ত হতে চাইবে কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন।
এ ছাড়া সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত বহুপাক্ষিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটও রয়েছে। ৩০ জুলাই গঠিত ওই জোটে মিসর, জর্ডান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ ১৪টি দেশ রয়েছে। লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে এর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক বিষয়ে সমন্বয়ের জন্য কাঠামো তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ কার্যপ্রণালি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
তুরস্কে চুক্তিটির সংসদীয় অনুমোদনের বিষয়টিও সামনে রয়েছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, সংস্থার কাঠামো, কার্যপ্রণালি ও নীতিমালা চূড়ান্ত করতে আরও কাজ বাকি। ফলে মক্কা চুক্তিকে এখনই ন্যাটোর মতো কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন।
এ কারণে সৌদি আরবের বর্তমান পদক্ষেপকে মক্কা চুক্তির ব্যর্থতা হিসেবে দেখার আগে চুক্তিটির প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সক্ষমতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন হলে রিয়াদের কাছে ইসরায়েলের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে দ্রুত কার্যকর করার সুযোগ থাকতে পারে।
তবে এই সহযোগিতার খবর এখনো সৌদি আরব বা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। তাই বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে দুই দেশের প্রকাশ্য বক্তব্য এবং মক্কা চুক্তির পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আগামী মাসগুলোতে চুক্তিটির আইনি অনুমোদন, যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো ও সামরিক সহযোগিতা কতটা এগোয়, সেটিই সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব কার্যকারিতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেবে।






