গঙ্গার পানি নিয়ে ভারতের নতুন সমীকরণ: বাংলাদেশের অধিকার সুরক্ষার দাবি

গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়নে বিহারের স্বার্থের আশ্বাস জয়শঙ্করের। ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদার চাপে বাংলাদেশের পানির হিস্যা কমার শঙ্কা, ন্যায্য হিস্যা ও ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চয়তা চায় ঢাকা।

টুইট প্রতিবেদক: ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের সময় বিহারের স্বার্থ বিবেচনায় রাখার আশ্বাস দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। ভারতের অভ্যন্তরীণ পানির চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন চুক্তি করা হলে বাংলাদেশের শুষ্ক মৌসুমের পানির হিস্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে আসন্ন নবায়ন আলোচনায় বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার ও ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

ভারতের জেডিইউ-এর জাতীয় কার্যকরী সভাপতি ও রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় কুমার ঝাকে লেখা ২৮ আগস্টের এক চিঠিতে জয়শঙ্কর জানান, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়ে ভারতের পানিশক্তি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে বিহার সরকারের প্রতিনিধিরাও অংশ নিয়েছেন। বিহারের পানীয় জল, সেচ ও শিল্পের চাহিদাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করে ‘উপযুক্ত সিদ্ধান্ত’ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। চুক্তি অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারেজে গঙ্গার পানি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাগাভাগি করা হয়।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভারতীয় রাজ্যগুলোর বাড়তি পানির চাহিদার বিষয়টি সামনে আসায় বাংলাদেশের উদ্বেগ আরও বাড়ছে। বিশেষ করে বিহার তাদের ভবিষ্যৎ পানির চাহিদা, এমনকি ২০৫০ সাল পর্যন্ত প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানালে গঙ্গার নিম্ন অববাহিকার দেশ বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুষ্ক মৌসুমে ন্যায্য ও নিশ্চিত পানির প্রবাহ। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে পানি বণ্টনের একটি কাঠামো থাকলেও সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চয়তা নেই। ফলে উজানে পানির চাহিদা বাড়লে কিংবা গঙ্গায় স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশ বাস্তবে আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও নতুন চুক্তিতে বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। গঙ্গা অববাহিকায় পানির প্রাপ্যতা, বৃষ্টিপাতের ধরন এবং শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহে পরিবর্তন হলে পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে পানি বণ্টন বাংলাদেশের জন্য ন্যায্য নাও হতে পারে। তাই নতুন চুক্তিতে হালনাগাদ ও যৌথভাবে যাচাই করা পানিপ্রবাহের তথ্য ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

গঙ্গার পানি বাংলাদেশের কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে সুন্দরবনসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি উৎপাদন, মিঠাপানির উৎস, নদীর নাব্যতা ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। দীর্ঘমেয়াদে এর সঙ্গে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশগত নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশের স্বার্থে তাই নতুন চুক্তিতে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম নিশ্চিত পানিপ্রবাহ, গঙ্গার পানিপ্রবাহ ও ব্যবহারসংক্রান্ত যৌথ ও স্বচ্ছ তথ্য বিনিময়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনা এবং চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা দ্রুত সমাধানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা।

চুক্তি নবায়ন বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন দীর্ঘমেয়াদি পানির নিশ্চয়তার সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বাড়তি পানির চাহিদা বাংলাদেশের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বিহারের স্বার্থকে আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়ার ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত।

তাই শুধু পুরোনো চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো নয়, বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা ও পানির অধিকারকে সুরক্ষিত করে নতুন বাস্তবতার আলোকে একটি ন্যায্য, টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণ পানি বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত ঢাকার প্রধান লক্ষ্য।

সূত্র: দ্য হিন্দু, ইকোনমিক টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত প্রতিবেদন, সেপ্টেম্বর ২০২৬।