ভারতের ৭৬৫ কেভি বিদ্যুৎ করিডোরে বাংলাদেশের চার শর্ত

আসাম থেকে বিহার পর্যন্ত সঞ্চালন লাইন নিতে ঢাকার সম্মতি মিলেনি; নেপাল-ভুটানের বিদ্যুৎ আমদানি ও পরিবেশগত ক্ষতিপূরণসহ জাতীয় স্বার্থে কঠোর অবস্থান।
বিশেষ প্রতিবেদন: আসামের বরনগর থেকে বিহারের কাটিহার পর্যন্ত ৭৬৫ কেভি উচ্চক্ষমতার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নির্মাণের যে প্রস্তাব ভারত দিয়েছে, তাতে সরাসরি সম্মতি দেয়নি ঢাকা। পার্বতীপুর হয়ে এই বিদ্যুৎ করিডোর নির্মাণে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের আগে চারটি শর্ত পূরণের বিষয় বিবেচনা করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার। সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শর্তগুলো পূরণ হলেই কেবল প্রকল্পটি নিয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
কেন এই বিদ্যুৎ করিডোর
ভারত দীর্ঘদিন ধরে এই করিডোর ব্যবহারের সুযোগ চেয়ে আসছে। এর মাধ্যমে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভারতের মূল ভূখণ্ডে নেওয়া সম্ভব হবে।
শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা ও নীতিগত সম্মতি ছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি আলোচিত হয়। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী সময়ে বর্তমান বিএনপি সরকার প্রকল্পটি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত আবারও বাংলাদেশকে এই লাইন নির্মাণের জন্য তাগিদ দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ঢাকা চারটি শর্ত সামনে আনছে বলে যুগান্তরসহ একাধিক গণমাধ্যম সরকারি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে।
বাংলাদেশের চার শর্ত
১. ব্রহ্মপুত্রের জলবিদ্যুৎ এই লাইনে নয়
ব্রহ্মপুত্র নদে বাঁধ দিয়ে উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ এই সঞ্চালন লাইন দিয়ে পরিবহন করা যাবে না। বাংলাদেশের মূল উদ্বেগ, ব্রহ্মপুত্রের পানিকে কাজে লাগিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির প্রবাহ কমে যেতে পারে।
২. নেপাল-ভুটানের বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে
বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটান থেকে তুলনামূলক সস্তা জলবিদ্যুৎ আমদানি করতে চায়। এই লাইন অথবা পৃথক গ্রিড ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ প্রস্তাবিত করিডোর শুধু ভারতের একচেটিয়া ব্যবহারের জন্য রাখা যাবে না।
৩. বাংলাদেশের পরিবহন সক্ষমতা আগে নির্ধারণ
প্রস্তাবিত সঞ্চালন লাইন দিয়ে বাংলাদেশ কত পরিমাণ বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারবে, তা আগে থেকেই নির্ধারণ ও নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ করিডোর ব্যবহারের বিনিময়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিবহন সক্ষমতা ও সুবিধা স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
৪. পরিবেশগত ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ
লাইন নির্মাণের কারণে পরিবেশের যে ক্ষতি হবে, তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ভারত দেবে কি না—এ বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি চায় ঢাকা। পরিবেশগত ক্ষতির দায় ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি চূড়ান্ত সমঝোতায় নিশ্চিত করার শর্ত দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব শর্ত পূরণ না হলে বাংলাদেশ করিডোর দেওয়ার সিদ্ধান্তে যাবে না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সূত্রের বক্তব্য, ভারত যেভাবে একতরফাভাবে এই লাইন ব্যবহারের সুযোগ চাইছে, ঢাকা সেভাবে বিষয়টি দেখছে না। বরং নেপাল-ভুটান-ভারত-বাংলাদেশ—এই চার দেশের সমন্বিত বিদ্যুৎ গ্রিডের বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ।
ভারতের জন্য কেন কঠিন হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শর্তগুলো ভারতের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ ভারতের মূল পরিকল্পনার সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে সম্ভাব্য ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জড়িত।
অন্যদিকে বাংলাদেশকে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগের সুযোগ দেওয়া হলে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যে ভারতের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমে যেতে পারে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রতিফলন
বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ওপর জোর দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন প্রকল্পে ভারতের একতরফা সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ছিল। বর্তমান অবস্থানকে তার বিপরীতে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সরকারের সমর্থকরা।
তবে একই সঙ্গে ঢাকা ভারতের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যানও করেনি। বরং বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সুযোগকে বৃহত্তর আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করে নিজেদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে চাইছে।
এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি
প্রস্তাবটি নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনা চলমান রয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের চার শর্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ভারতের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ করিডোরের চাওয়াকে সরাসরি নাকচ না করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি শর্ত সামনে এনেছে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্রের পানির প্রবাহ, নেপাল-ভুটানের জলবিদ্যুৎ আমদানি, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিবহন সক্ষমতা এবং পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ—এই চার বিষয়কে কেন্দ্র করে ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট।
বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই এই শর্তগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সরকারের সমর্থকদের দাবি। এখন দেখার বিষয়, ভারত এসব শর্ত মেনে নিয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার পথে এগোয় কি না।






