এআই দিয়ে সাইবার হামলা বাড়ছে, ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো

গুগল-মাইক্রোসফটসহ প্রায় ১০০ প্রতিষ্ঠানের সতর্কবার্তা, নিরাপত্তা জোরদারে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান
টুইট ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে। ভবিষ্যতে এআই ব্যবহার করে আরও দ্রুত, স্বয়ংক্রিয় ও জটিল সাইবার হামলা চালানো সম্ভব হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতিতে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্বের প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠান।
গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে। ব্যাংক, অর্থপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানও এতে অংশ নিয়েছে।
চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এআই ব্যবহার করে পরিচালিত সাইবার হামলা আরও ব্যাপক ও জটিল হয়ে উঠতে পারে। অথচ বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থা এই পরিবর্তিত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এসব গুরুত্বপূর্ণ খাতে দীর্ঘদিন ধরে সাইবার নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবল বরাদ্দ করা হয়নি। ফলে এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকলে বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এ অবস্থায় সরকারগুলোর প্রতি প্রতিরক্ষামূলক কাজে সক্ষম এআই প্রযুক্তি সরবরাহ এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যাপ্ত অর্থ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন সাইবার হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চীনভিত্তিক হ্যাকাররা দেশটির সিনেট, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিচার বিভাগের বিভিন্ন ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছে।
এদিকে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটার তৈরি বিভিন্ন এআই ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এমন আচরণের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।
জুলাইয়ে ওপেনএআইয়ের কয়েকশ এআই এজেন্টের পরীক্ষায় দেখা যায়, তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য গোপন বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। পরে সমন্বিতভাবে হাগিং ফেসের ব্যবস্থায় হামলা চালানোর সক্ষমতাও তারা দেখিয়েছে। ঘটনাটিকে এআই-চালিত সাইবার হামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পানি ও পয়োনিষ্কাশন খাতও নতুন করে সাইবার হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে। দেশটির অন্তত সাতটি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি হামলার শিকার হয়েছে। এরপর কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে।
তবে উদ্বেগের একটি বড় জায়গা হলো, সবচেয়ে শক্তিশালী এআই ব্যবস্থাগুলো এখনো সবার জন্য সহজলভ্য নয়। খোলা চিঠিতে তাই শক্তিশালী এআই প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি দায়িত্বশীলভাবে এসব প্রযুক্তির সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এআই গবেষকদের মধ্যেও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। গবেষক অ্যান্ড্রু ইউন সতর্ক করে বলেছেন, সামনে এআই ব্যবহার করে সাইবার হামলার নজিরবিহীন ঢেউ দেখা যেতে পারে। তার মতে, শুধু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করলেই হবে না; এআই প্রযুক্তি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিরাপত্তায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ঝুঁকিপূর্ণ এআই ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও আলোচনা চলছে। কয়েকজন সিনেটর ‘কিল সুইচ আইন’ নামে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন, যার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এআই ব্যবস্থা বন্ধ করার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
নোবেলজয়ী প্রযুক্তিবিদ জিওফ্রি হিন্টনও এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক করেছেন। তার আশঙ্কা, কোনো পর্যায়ে এআই মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠলে এবং সেই ঝুঁকি মোকাবিলার কার্যকর উপায় খুঁজে না পাওয়া গেলে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর খোলা চিঠির মূল বার্তা স্পষ্ট—এআইয়ের সক্ষমতা আরও বাড়ার আগেই সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। হামলার প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, প্রতিরক্ষার প্রস্তুতিও তত দ্রুত না বাড়ালে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।






