যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় অচলাবস্থা, সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান বৈঠকে অগ্রগতি নেই, নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারিতে নতুন উত্তেজনা।

বিশ্ব ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এখনো চূড়ান্ত কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে—পারস্পরিক অবিশ্বাস ও শর্তের অমিলই আলোচনার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি মি. ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা হলেও তারা এমন কোনো পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেননি, যেখানে তেহরান ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত। তবে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় ‘যথেষ্ট নমনীয়তা’ দেখিয়েছে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা বজায় রেখেছে।

অন্যদিকে, ইরানের অবস্থান আরও কঠোর ও নীতিগত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় আলোচনাকে ‘নিবিড়’ হিসেবে উল্লেখ করলেও সতর্ক করে বলেন, এই প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করছে প্রতিপক্ষের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার ওপর। তিনি সরাসরি ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অতিরিক্ত দাবি ও বেআইনি অনুরোধ’ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং ইরানের ‘বৈধ অধিকার ও স্বার্থ’ স্বীকার করতে হবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আলোচনায় হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং চলমান সংঘাতের পূর্ণ অবসান—এই তিনটি ইস্যু সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

এদিকে, আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এক বিবৃতিতে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এখনো শেষ হয়নি। তার ভাষায়, ‘আমরা এখনও তাদের বিরুদ্ধে লড়ছি, আরও অনেক কিছু করার বাকি আছে।’

নেতানিয়াহু একইসঙ্গে লেবাননের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার অনুমোদনের কথাও জানিয়েছেন, যা একদিকে কূটনৈতিক উদ্যোগ হলেও অন্যদিকে ইরানবিরোধী সামরিক অবস্থান অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত বহন করে। তিনি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসে ইসরায়েলের ‘সাফল্য’ দাবি করেছেন, যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সংঘাতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যস্থতায় গত ৭ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। তবে বর্তমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে—এই যুদ্ধবিরতি কতটা টেকসই হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনা একটি জটিল কৌশলগত খেলায় রূপ নিয়েছে, যেখানে প্রত্যেক পক্ষ নিজেদের সর্বোচ্চ স্বার্থ নিশ্চিত করতে চাইছে। ইরান তার সার্বভৌম অধিকার ও আঞ্চলিক প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে দৃঢ়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা ও পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক চাপ যুক্ত হওয়ায় পুরো পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
ফলে, শান্তি আলোচনার পথ এখনো খোলা থাকলেও বাস্তবতা বলছে, সংঘাতের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।