জমি বিরোধে ঘর ভাঙচুর, ছয় দিন খোলা আকাশের নিচে পরিবার

দুটি গরু, নগদ টাকা ও আসবাবপত্র লুটের অভিযোগ; বাড়িতে ফিরলে প্রাণনাশের হুমকির দাবি।
টুইট প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পৈতৃক জমি নিয়ে বিরোধের জেরে বসতঘর ভাঙচুর, মালামাল লুট ও পরিবারের সদস্যদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে। ঘটনার পর ছয় দিন ধরে নারী ও শিশুসহ একটি পরিবারের সদস্যরা খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। বাড়িতে ফিরতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সীতাকুণ্ড পৌরসভার নুনাছড়া এলাকার চৌকিদার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় রেজাউল করিম মানিক, নুর করিম ও সুজনসহ অজ্ঞাতপরিচয় ১৫ থেকে ২০ জনের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন খোরশিদা আক্তার।
অভিযোগ অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে বাবার বাড়িতে বসবাস করছেন খোরশিদা। তাঁদের পৈতৃক জমি নিয়ে প্রতিবেশী রেজাউল করিম মানিকের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার মীমাংসার চেষ্টা করেও সমাধান হয়নি। এ নিয়ে দুই থেকে তিন মাস আগে খোরশিদার ভাই মো. ইউসুফ আদালতে মামলা করেন, যা এখনো বিচারাধীন।
খোরশিদার দাবি, গত মঙ্গলবার সকালে পুরোনো বসতঘর ভেঙে নতুন ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করলে ১৫ থেকে ২০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি তাঁদের বাড়িতে হামলা চালান। বাধা দিতে গেলে পরিবারের সদস্যদের মারধর করা হয় এবং দেশীয় অস্ত্র দিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এতে তাঁর মা হাসিনা আক্তার ও ভাবি রুনা আক্তার আহত হন। পরে তাঁদের সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। উপপরিদর্শক নুরুল্লাহ প্রথমে কয়েকজনকে আটক করলেও পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ফোন পেয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর অভিযুক্তরা আবার ফিরে এসে ভাঙচুর ও লুটপাট চালান।
খোরশিদার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা তাঁদের দুটি গরু নিয়ে গেছেন, যার আনুমানিক মূল্য দেড় লাখ টাকা। এ ছাড়া ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও দুটি মুঠোফোন ভাঙচুর করা হয়েছে। তাঁর ও ভাবির জমানো ৭০ হাজার টাকাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হামলার সময় তাঁদের শ্লীলতাহানি এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করার অভিযোগও করেছেন তিনি।
খোরশিদার ভাই মো. ইউসুফ দাবি করেন, তাঁদের পৈতৃক জমি জাল দলিলের মাধ্যমে দখল করা হয়েছে। পরে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে জায়গাটি বুঝিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার না করে ঘর ভাঙচুরের বিষয়টি স্বীকার করেছেন প্রধান অভিযুক্ত রেজাউল করিম মানিক। তাঁর দাবি, তিনি বহু আগে জমিটি কিনেছেন এবং সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে ভোগদখলে রেখেছেন। কয়েক দিন আগে প্রতিপক্ষ সেখানে ঘর নির্মাণ করলে তা ভাঙা হয়। এ কাজ একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শে করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, অভিযুক্তদের আটক করে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে উপপরিদর্শক নুরুল্লাহ বলেন, ৯৯৯-এর ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কয়েকজনকে প্রাথমিকভাবে আটক করা হলেও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ফোন পেয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অবগত ছিলেন।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহিনুল ইসলাম জানান, ভাঙচুরের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। পুলিশ দুই পক্ষকে আলাদা করে দেয় এবং জমির মালিকানা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তির পরামর্শ দেয়। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পৈতৃক জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে একটি পরিবারের নারী ও শিশুদের ছয় দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে থাকার অভিযোগ ঘটনাটিকে মানবিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত উদ্বেগের বিষয় করে তুলেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন জরুরি।






