জলদস্যুতা ঠেকাতে হরমুজের কাছাকাছি অভিযান বাড়াচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া

মোতায়েন হচ্ছে অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম। সোমালিয়া থেকে ওমানের দক্ষিণ উপকূল পর্যন্ত বাড়ছে চেওংহে ইউনিটের কার্যক্রম; জনবল বাড়বে ৭৫, সংসদের অনুমোদনের অপেক্ষা।

বিশ্ব ডেস্ক: হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি আরব সাগরে জলদস্যুবিরোধী অভিযান সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। এ লক্ষ্যে সোমালিয়ার উপকূলে চলমান দেশটির নৌবাহিনীর চেওংহে (Cheonghae) ইউনিটের অভিযান এলাকা বাড়িয়ে ওমানের দক্ষিণ সমুদ্রসীমা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে।

একই সঙ্গে ইউনিটটির সক্ষমতা বাড়াতে অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম, বিমান, বিশেষায়িত দল এবং জনবল মোতায়েনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ইয়োনহাপসহ দক্ষিণ কোরিয়ার একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে এডেন উপসাগরে মোতায়েন থাকা চেওংহে ইউনিটের অভিযান এলাকা উত্তর-পূর্ব দিকে আরব সাগরে সম্প্রসারণ করা হবে। নতুন এলাকার সীমা ওমানের দক্ষিণ উপকূলের ডুকম বন্দরের দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এতে ইউনিটটির অভিযান পরিচালনার পরিধি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৩০ কিলোমিটারে দাঁড়াবে। তবে সম্প্রসারিত অভিযান এলাকাটি হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার দূরে থাকবে। এর আওতায় ওমান উপসাগর কিংবা হরমুজ প্রণালির অভ্যন্তরীণ জলসীমা অন্তর্ভুক্ত হবে না।

এদিকে চেওংহে ইউনিটের বিদেশে মোতায়েনের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব জাতীয় পরিষদে উত্থাপন করবে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার। চলতি বছরের শেষেই ইউনিটটির বর্তমান মোতায়েনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী সপ্তাহে মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি জাতীয় পরিষদে পাঠানো হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার আইন অনুযায়ী, বিদেশে সামরিক বাহিনী মোতায়েন কিংবা বিদ্যমান কোনো সামরিক মিশনের কার্যক্রম সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক।

অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে ইউনিটটিতে একটি পি-৮এ পোসেইডন সামুদ্রিক টহল বিমান, বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ (ইওডি) দল এবং মানববিহীন মাইন অপসারণের সরঞ্জাম যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব সরঞ্জামের মধ্যে মানববিহীন পানির নিচে চলাচলকারী যান এবং পানির ওপর চলাচলকারী যানও থাকবে। পাশাপাশি ইউনিটটির জনবল ৭৫ জন বাড়িয়ে মোট ৩৯৫ জনে উন্নীত করা হবে। বর্তমানে এ ইউনিটে সর্বোচ্চ প্রায় ৩২০ জন সদস্য মোতায়েনের অনুমতি রয়েছে।

নতুন পরিকল্পনায় চেওংহে ইউনিটের দায়িত্বের পরিধিও বাড়ানো হচ্ছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের পথগুলোতে নৌচলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় সহায়তা করার বিষয়টি নতুন মিশন হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমালিয়া ও এডেন উপসাগরীয় অঞ্চলে জলদস্যুতার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় অভিযান সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ওই অঞ্চলে জলদস্যুতার ঘটনা ছিল ১১টি। চলতি বছর এ পর্যন্ত তা বেড়ে ৩৬টিতে দাঁড়িয়েছে।

কর্মকর্তাদের মতে, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর উপস্থিতি কমে গেছে। এর সুযোগে জলদস্যুতার ঘটনা বেড়েছে। একই সঙ্গে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর পর গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথগুলো সচল ও নিরাপদ রাখতে বিভিন্ন দেশের উদ্যোগে দক্ষিণ কোরিয়ার ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছিল।

তবে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার স্পষ্ট করেছে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশটি কোনো যুদ্ধে সরাসরি জড়াবে না কিংবা আঞ্চলিক সংঘাতে হস্তক্ষেপ করবে না। চেওংহে ইউনিট দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের অধীনে স্বাধীনভাবে অভিযান পরিচালনা করবে। এটি কোনো আন্তর্জাতিক সামরিক জোটের অধীনে কাজ করবে না।

এ ছাড়া পি-৮এ পোসেইডন সামুদ্রিক টহল বিমান দিয়ে ইরানের ভূখণ্ড, আঞ্চলিক জলসীমা কিংবা হরমুজ প্রণালির অভ্যন্তরে কোনো নজরদারি চালানো হবে না। ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণ কিংবা অন্য কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন হলে সে জন্য পৃথক সংসদীয় অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি যুদ্ধের অবসানসহ নিরাপদ পরিস্থিতি নিশ্চিত হওয়াও এ ধরনের অভিযানে অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে দক্ষিণ কোরিয়ার এই সিদ্ধান্তকে ওয়াশিংটনের প্রতি আংশিক সাড়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর আগে তেহরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল সিউল। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি নির্ভরতা এ সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিবেচ্য বিষয়। দেশটির মোট তেল আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, এ নির্ভরতার পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ।

সব মিলিয়ে, জলদস্যুতা প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ সচল রাখার লক্ষ্যেই চেওংহে ইউনিটের অভিযান সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে প্রস্তাবিত সম্প্রসারণ, অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম ও জনবল মোতায়েন এবং মিশনের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়গুলো এখনো জাতীয় পরিষদের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

সূত্র: ইয়োনহাপ ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।