আপত্তিকর ভিডিও বিতর্কে চাপে এমপি আব্দুল আজিজ, হারাতে পারেন পদ-পদবি

শাকিল হত্যা মামলায় ছেলের রিমান্ডের পর নতুন বিতর্ক; ভিডিওকে এআই দিয়ে তৈরি ও ষড়যন্ত্রের অংশ বলে দাবি এমপির, তদন্ত করছে জেলা বিএনপি।
নিজস্ব প্রতিবেদক: নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর–বড়াইগ্রাম) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় তাঁর বড় ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টুর গ্রেপ্তার ও রিমান্ড এবং শাকিলের জানাজায় হেনস্তার ঘটনার পর এবার এমপির বলে দাবি করা একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এ ঘটনায় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও দলীয় পদ-পদবি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে তাঁর সংসদ সদস্য পদ হারানোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল থেকে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। এতে একজন পুরুষকে নগ্ন বা আধা-নগ্ন অবস্থায় এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর কথোপকথনে দেখা ও শোনা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আশফাক আহমেদ’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়।
তবে ভিডিওটি আসল কি না, এতে থাকা ব্যক্তি সত্যিই সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ কি না এবং সংশ্লিষ্ট নারীর পরিচয় কী—তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এমপি আব্দুল আজিজ ভিডিওটিকে বানোয়াট দাবি করে বলেছেন, নির্বাচনের আগে থেকেই তিনি নিজ দল ও বিরোধী পক্ষের ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই ভিডিওটি তৈরি করে ছড়ানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিনি ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত। এর মধ্যে ভিডিও ছড়িয়ে তাঁকে আরও বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও জানান তিনি।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এমপি পরিবারসহ গা ঢাকা দিয়েছেন বলে দাবি করা হলেও, তাঁর অবস্থান সম্পর্কে এ তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
উপজেলা বিএনপির সংবাদ সম্মেলন
বুধবার বিকেলে গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে ধারাবারিষা ইউনিয়নের নয়াবাজার এলাকায় দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ আলী লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন, ‘আশফাক আহমেদ’ নামের ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশিত ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এবং এর উদ্দেশ্য এমপির মানহানি করা। ভিডিও ছড়ানোর ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানান তিনি।
অন্যদিকে, নাটোর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান আসাদ জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে শুক্রবার জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দলের হাইকমান্ডকে জানানো হবে।
জেলা বিএনপি ভিডিওটির সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। ভিডিও বিতর্কের পর নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়া বাইপাস চত্বরসহ বিভিন্ন এলাকায় এমপির ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার খবরও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর মধ্যে ক্ষোভ এবং তাঁর পদত্যাগের দাবি ওঠার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
শাকিল হত্যা মামলা ও এমপিপুত্রের রিমান্ড
গত ১৪ অক্টোবর গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলামকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৬ অক্টোবর রাতে ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টুকে আটক করে পুলিশ। পরে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হলে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মিন্টু গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও পরিচিত বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
২৭ অক্টোবর শাকিলের জানাজায় বক্তব্য দেওয়ার সময় আব্দুল আজিজকে ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপস্থিত নেতাকর্মীদের একাংশ তাঁকে উদ্দেশ করে স্লোগান দেন এবং তিনি হেনস্তার শিকার হন। এর পরদিনই কথিত আপত্তিকর ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে।
তবে হত্যা মামলায় মিন্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
পদ-পদবি হারানোর আশঙ্কা কতটা
ভিডিও বিতর্কে আব্দুল আজিজের রাজনৈতিক অবস্থান চাপে পড়লেও তাঁর সংসদ সদস্য পদ বা দলীয় পদ হারানো নিশ্চিত নয়। জেলা বিএনপি তদন্তের ফলের ভিত্তিতে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ফলে তাঁর পদ-পদবি নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তদন্তের ফলাফল ও দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের ওপর। অভিযোগ প্রমাণিত হলে হারাতে পারেন পদ-পদবি। বর্তমানে কঠিন বাস্তবতা ও তদন্তের মুখে পড়েছেন এমপি আব্দুল আজিজ।
কয়েকজন ছাত্র ও যুবনেতা এমপির বক্তব্য ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের ভাষ্য, তিনি অভিযোগের সঙ্গে জড়িত না থাকলে প্রকাশ্যে এসে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত। তবে এটি তাঁদের মতামত; অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের বিকল্প নয়।
সার্বিকভাবে, শাকিল হত্যা মামলা, এমপিপুত্রের রিমান্ড, জানাজায় উত্তেজনা ও কথিত ভিডিও—পরপর এসব ঘটনায় আব্দুল আজিজকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক বেড়েছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা ও উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া তাঁর পদ হারানোর বিষয়টিও নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
সম্পাদকের নোট: ভিডিওটির সত্যতা, এতে থাকা ব্যক্তির পরিচয় ও উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এমপি ও উপজেলা বিএনপির বক্তব্য অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সূত্র: ঢাকা পোস্ট, মানবজমিনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য।






