প্রধানমন্ত্রী মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যেতে বলেছেন: ইশরাক

পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। ঘন্টিঘর অভিযানে অস্ত্র বহন, মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের দাবি প্রতিমন্ত্রীর; সংবাদ সম্মেলনে সমর্থকদের স্লোগানে সাংবাদিকদের কাজে বিঘ্ন।
নিজস্ব প্রতিবেদক: মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তবে প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ না করে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখা এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ইশরাক হোসেন। এ সময় গত ১৭ অক্টোবর পুরান ঢাকার ঘন্টিঘর এলাকায় পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন তিনি। অভিযানে নিজের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা, মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের দাবি এবং এ নিয়ে গণমাধ্যমের সংবাদ প্রকাশের বিষয়েও বক্তব্য দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাকের সমর্থকদের উপস্থিতি ও স্লোগানকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটে।
পদত্যাগের প্রস্তাব ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ
ইশরাক হোসেন বলেন, ঘন্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি আলোচনা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল মাদক নির্মূল করা। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিযানের চেয়ে তার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
এতে সরকারের বৃহত্তর উদ্যোগ আড়ালে পড়ে যাচ্ছে এবং দল বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছে বলে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানান। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছাও প্রকাশ করেন।
ইশরাকের দাবি, প্রধানমন্ত্রী তাকে মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে এবং স্থানীয় সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করার নির্দেশ দেন। সোমবারের সংবাদ সম্মেলনেও তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগের প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন।
ঘন্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান
ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘন্টিঘর এলাকার মাদক সমস্যা সমাধানে একাধিকবার পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে জানান ইশরাক। বিষয়টি ঢাকা-৬ আসনের মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভাতেও উত্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় মাদক বিক্রি ও সরবরাহের একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযানে অংশ নেন তিনি।
ইশরাক জানান, এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাবও ছিল। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আধা-সরকারি পত্রের (ডিও লেটার) মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়েছিল। ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য স্থান নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি আরও জানান, গত ১৮ সেপ্টেম্বর তার মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সভায় ঘন্টিঘর এলাকার মাদক সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। পুলিশের জনবল ও সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের অংশগ্রহণে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এলাকাটিকে মাদকমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ইশরাকের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১২ আগস্ট এলাকায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে তিনজন বেসামরিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হওয়ার তথ্যও তারা জানতে পারেন। এ ধরনের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই অভিযানে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
আত্মরক্ষায় অস্ত্র বহনের দাবি
অভিযানের সময় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে থাকার বিষয়ে ইশরাক বলেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য তার বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে। অভিযানের সময় সরকারি বরাদ্দপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীরাও তার সঙ্গে ছিলেন।
তার দাবি, ঘটনাস্থলে প্রবেশের পর ২৫ থেকে ৩০ জনকে ওই এলাকা থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। সে সময় আত্মরক্ষার প্রয়োজনে তিনি লাইসেন্স করা অস্ত্রটি বের করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাকে অস্ত্র হাতে দেখা গেলেও পরে সেটি পকেটে রেখে দেন বলে জানান তিনি। এরপর প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে এলাকার বিভিন্ন স্থানে হেঁটে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় গেন্ডারিয়া থানাকে বিষয়টি জানানো হলে পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান বলে দাবি করেন তিনি।
মাদক, মোবাইল ফোন ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের দাবি
ইশরাক হোসেনের দাবি, অভিযানের সময় কয়েকটি ভবনে তল্লাশি চালিয়ে বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন, স্কুলব্যাগভর্তি আরও মোবাইল ফোন, প্রায় ৩০০ গ্রাম হেরোইন, কয়েক বোতল মদ এবং চাপাতিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
তার ধারণা, উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোনগুলোর কয়েকটি চুরি বা ছিনতাই করা হয়ে থাকতে পারে। তার দাবি অনুযায়ী, পুলিশের উপস্থিতিতে এসব সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিরা উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মালিকানা কিংবা সেগুলোর উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
ইশরাক বলেন, অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা, যাতে বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়। অভিযানের সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলা ও তাদের আশ্বস্ত করারও চেষ্টা করা হয়।
পরে তার সঙ্গে থাকা স্বেচ্ছাসেবকেরা মাদক বেচাকেনায় ব্যবহৃত অস্থায়ী স্থাপনাগুলো ভেঙে দেন বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং উদ্ধার হওয়া সব সামগ্রী পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও দাবি করেন ইশরাক।
মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ নেই
ইশরাক হোসেন বলেন, অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ছিল মাদক নির্মূল করা। কিন্তু গণমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনে তার অস্ত্র হাতে থাকার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় মাদকবিরোধী উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, “এটি মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এখানে আমার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই, দলীয় স্বার্থ নেই, রাজনৈতিক স্বার্থও নেই।”
ইশরাকের দাবি, ঘন্টিঘর এলাকা শুধু মাদক সেবনের স্থান ছিল না; সেখানে মাদক সরবরাহ ও বেচাকেনারও একটি কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।






