যশোরের ৭ হাসপাতালে ৪৫৭ পদ শূন্য, চিকিৎসক সংকটে সেবা

৫০ শয্যার হাসপাতালে রোগী ১০০ জন পর্যন্ত, অচল যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞের অভাবে ভোগান্তিতে রোগীরা

টুইট প্রতিবেদক: যশোরের সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনুমোদিত ১ হাজার ৩৯৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৯৪১ জন। শূন্য রয়েছে ৪৫৭টি পদ, যা মোট পদের প্রায় ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে চিকিৎসকের ২৮৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৬৭ জন। অর্থাৎ চিকিৎসকের ১২০টি পদই শূন্য।

জনবল সংকটের পাশাপাশি অতিরিক্ত রোগীর চাপ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এবং চিকিৎসার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি অচল থাকায় ব্যাহত হচ্ছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা। কোনো কোনো ৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন ৯০ থেকে ১০০ জন রোগী ভর্তি থাকছেন। সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

পরিস্থিতির কারণে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা জেলা শহরে। এতে বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি দুর্ভোগও বাড়ছে সাধারণ মানুষের।

যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, বাঘারপাড়া, অভয়নগর, শার্শা, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জনবলসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।

শয্যার তুলনায় রোগী বেশি, চিকিৎসক সংকট তীব্র
চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন ভর্তি থাকছেন ৯০ থেকে ১০০ জন রোগী।

চিকিৎসকের ৪৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২৫ জন বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আহসানুল মিজান রুমীর ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা ২৪ জন।

তিনি জানান, হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হলেও অ্যানাস্থেশিয়া চিকিৎসকের পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। আল্ট্রাসোনোগ্রাম যন্ত্র থাকলেও তা পরিচালনার জন্য চিকিৎসক নেই। হাসপাতালের মোট ২২১টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১২৭ জন। শূন্য রয়েছে ৯৪টি পদ।

মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই পরিস্থিতি। ৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন ৯০ থেকে ১০০ জন রোগী ভর্তি থাকছেন। চিকিৎসকের ৪৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৬ জন। হাসপাতালের ২৪৭টি পদের মধ্যে ১৬৯টি পূরণ হয়েছে। শূন্য রয়েছে ৭৮টি পদ।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফাইয়াজ আহমেদ ফয়সাল বলেন, অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে জনবল সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি থাকছেন ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী।

চিকিৎসকের ৩৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২৪ জন। হাসপাতালের ১৩৮টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ১১০ জন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেন, রোগীর চাপ বিবেচনায় হাসপাতালে আরও জনবল প্রয়োজন।

অস্ত্রোপচারেও মিলছে না নিয়মিত সেবা

ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ৪৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৯ জন। জনবল সংকটের কারণে সেখানে সপ্তাহে মাত্র এক দিন, বৃহস্পতিবার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুর রশিদ জানান, জনবল সংকটের মধ্যেই চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। অ্যানাস্থেশিয়া চিকিৎসক থাকলেও তিনি সপ্তাহে তিন দিন ঝিকরগাছায় দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়।

এক্স-রে ও আল্ট্রাসোনোগ্রাম যন্ত্র থাকলেও

আল্ট্রাসোনোগ্রাম করার জন্য সরকারি চিকিৎসক নেই।
হাসপাতালের ২২৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৮২ জন। শূন্য রয়েছে ৪৬টি পদ।

বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও চিকিৎসক সংকট তীব্র। সেখানে চিকিৎসকের ৪০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২০ জন। অ্যানাস্থেশিয়া চিকিৎসক থাকলেও তিনি সপ্তাহে মাত্র দুই দিন বাঘারপাড়ায় দায়িত্ব পালন করেন। বাকি চার দিন যশোর সদর হাসপাতালে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয় তাঁকে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অরুপ জ্যোতি ঘোষ বলেন, সীমিত জনবল দিয়ে বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। হাসপাতালের ১৫০টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ১০৪ জন। শূন্য রয়েছে ৪৬টি পদ।

শার্শা ও কেশবপুরে জনবল-যন্ত্রপাতির ঘাটতি

শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ৩০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৮ জন। অ্যানাস্থেশিয়া চিকিৎসক থাকলেও তাঁকে যশোর সদর হাসপাতালে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। হাসপাতালের ১৯৪টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ১০২ জন। শূন্য রয়েছে ৯২টি পদ।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌফিক পারভেজ বলেন, চিকিৎসক সংকটের মধ্যেই হাসপাতালের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।

কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। চিকিৎসকের ৪৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৫ জন। হাসপাতালের ২২০টি পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ১৪৭ জন। শূন্য রয়েছে ৭৩টি পদ।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেহেনেওয়াজ জানান, প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্যাথলজি বিভাগ চালু থাকলেও প্যাথলজিস্ট নেই। এ ছাড়া হাসপাতালের এক্স-রে ও আল্ট্রাসোনোগ্রাম যন্ত্র অচল। ফলে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে।

দ্রুত সংকট সমাধানের আশ্বাস সিভিল সার্জনের

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগীর চাপ দ্রুত বাড়লেও সে অনুযায়ী চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল বাড়েনি। ফলে শয্যার অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে সীমিতসংখ্যক জনবলকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অচল যন্ত্রপাতি মেরামত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও কারিগরি কর্মী নিয়োগ না হওয়ায় রোগীদের জেলা শহর কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় চাহিদা জানানো হয়েছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সার্বিক পরিস্থিতি বলছে, উপজেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা স্বাভাবিক রাখতে শুধু শূন্য পদ পূরণ নয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও কারিগরি কর্মী নিশ্চিত করা এবং অচল যন্ত্রপাতি সচল করাও জরুরি। অন্যথায় চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা ও বাড়তি ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে।