বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয়েও হুথিদের হামলার ঝুঁকিতে সৌদি আরব

বিশাল ভূখণ্ড, সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলা ও অস্ত্রের সীমাবদ্ধতায় চাপে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা
টুইট ডেস্ক : প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করেও ইয়েমেনের হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারছে না সৌদি আরব। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড, একাধিক দিক থেকে আসা হুমকি এবং হুথিদের পরিবর্তিত হামলাপদ্ধতি সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
স্টকহোমভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসআইপিআরআইয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর সৌদি আরব প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সামরিক সরঞ্জামও সংগ্রহ করেছে দেশটি।
তবে বিপুল সামরিক সরঞ্জাম থাকলেই সব হামলা ঠেকানো সম্ভব হয় না। সৌদি আরবের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার, পাইপলাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এসব স্থাপনা একসঙ্গে সুরক্ষিত রাখতে হলে আকাশপথে আসা হুমকি দ্রুত শনাক্ত করা, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সময়ে একাধিক দিক থেকে হামলা হলে এই কাজ আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সৌদি আরবকে দক্ষিণে ইয়েমেনের হুথি, পূর্বে ইরান এবং উত্তরে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কোথায় এবং কী পরিমাণে মোতায়েন করা হবে, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
হুথিদের হামলাপদ্ধতিও প্রতিরক্ষার চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে। তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিচু দিয়ে উড়তে পারে বলে রাডারে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। বিভিন্ন গতি, উচ্চতা ও গতিপথের অস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করা হলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়ে।
হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ভূমিকা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে ইয়েমেনে ইরানি উৎসের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ, ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জামের তথ্য তুলে ধরেছেন। তবে হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থও রয়েছে।
দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থানের কারণে হুথিদের সামরিকভাবে পরাস্ত করাও কঠিন। অতীতের বিভিন্ন সামরিক অভিযান তাদের সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। ফলে শুধু বিমান হামলা চালিয়ে তাদের হামলার ঝুঁকি স্থায়ীভাবে দূর করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামনে সামরিক ও কূটনৈতিক—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জই রয়েছে। একদিকে আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘ সংঘাতের অর্থনৈতিক ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি বাড়লে বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
অস্ত্রের মজুত ও সরবরাহও বড় বিবেচ্য বিষয়। উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রতিটি হামলা ঠেকানোর চেষ্টা ব্যয়বহুল হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর নিজস্ব সামরিক চাহিদা ও রাজনৈতিক হিসাব সৌদি আরবের জন্য নতুন প্রতিরক্ষাসরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে যে সামরিক খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করাই পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। বিস্তৃত ভূখণ্ড, বহুমুখী হুমকি, সমন্বিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মোকাবিলায় উন্নত অস্ত্রের পাশাপাশি কার্যকর গোয়েন্দা নজরদারি, প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সমন্বয় ও কূটনৈতিক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।






