৩৩ হাজার মণ্ডপে উৎসব, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের বিশেষ ছক

দুর্গাপূজায় তিন স্তরের নিরাপত্তা, প্রস্তুত থাকবে সোয়াট ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল। প্রায় ৩৩ হাজার পূজামণ্ডপ ঘিরে পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা; গুজব ও সাম্প্রদায়িক উসকানির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ আইজিপির
টুইট প্রতিবেদক: হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। পূজার আগে, পূজা চলাকালীন এবং প্রতিমা বিসর্জন ও পূজা-পরবর্তী সময়, এই তিন পর্যায়ে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশের পাশাপাশি সোয়াট, ক্রাইম রেসপন্স টিম (সিআরটি), কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট প্রস্তুত থাকবে।
রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের হল অব প্রাইডে শারদীয় দুর্গাপূজা ২০২৬ উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাবিষয়ক সভায় সভাপতিত্বকালে এসব কথা বলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, বিপিএম।
আইজিপি বলেন, দুর্গাপূজা ঘিরে পুলিশের নিরাপত্তা কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে কোনো মহল বা গোষ্ঠী যাতে সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতি বছরের মতো এবারও দুর্গাপূজা নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হবে বলে তিনি আশাবাদী। পূজার আনন্দময় পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান আইজিপি।
গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা
সভায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট, অপপ্রচার, গুজব কিংবা ছবি আপলোডের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বিভিন্ন ধর্মের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং নিয়মিত পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কেউ যাতে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে, সে জন্য পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।
যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ অথবা নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ও স্বেচ্ছাসেবক রাখার আহ্বান
পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা জোরদারে আয়োজকদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দকে পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা সক্রিয় রাখা, পূজামণ্ডপ ও প্রতিমা বিসর্জনস্থলে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা এবং বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর প্রস্তুত রাখার অনুরোধ জানানো হয়।
এ ছাড়া প্রতিটি পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তুত থাকবে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট
দুর্গাপূজার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশের পাশাপাশি বিশেষায়িত নিরাপত্তা দলগুলো সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে সোয়াট, ক্রাইম রেসপন্স টিম (সিআরটি), কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি), ক্রাইম সিন ভ্যান এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট।
এ ছাড়া পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সসহ পুলিশের অন্যান্য ইউনিটে সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল চালু থাকবে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে পূজাকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থায় সন্তোষ প্রকাশ নেতৃবৃন্দের
সভায় উপস্থিত বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ দুর্গাপূজা উপলক্ষে গৃহীত নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় তাঁরা সরকার ও পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান।
সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন, এসআরইউর অতিরিক্ত আইজি মোঃ রেজাউল করিম, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, নৌ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মোঃ রেজাউল করিম, এসআরবির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত আইজি) মোঃ আহসান হাবীব পলাশ, ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজি জি এম আজিজুর রহমান, অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোঃ সায়েদুর রহমান, রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ভারপ্রাপ্ত) ব্যারিস্টার মোঃ জিল্লুর রহমান, হাইওয়ে রেঞ্জের অতিরিক্ত আইজি ফারুক আহমেদ এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) প্রধান ও অতিরিক্ত আইজি মোঃ কামরুল আহসান।
এ ছাড়া হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন মজুমদার, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি নির্মল রোজারিও ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর ও সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রমেশ দত্ত, কল্যাণ ফ্রন্টের ট্রাস্টি ও ভাইস চেয়ারম্যান জয়দেব রায়, পূজা উদযাপন ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক রূপন চন্দ্র দাস, ঢাকা মহানগর উত্তর কৃষক দল পূজা ফ্রন্টের যুগ্ম আহ্বায়ক অলোক বসু এবং রমনা কালী মন্দিরের সদস্য সচিব শ্রী মিঠুন কুমার দাস সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের ম্যানেজার স্বামী দেবধ্যানানন্দ, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ ও সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব দেবেন্দ্র নাথ উরাঁও, কল্যাণ ফ্রন্টের যুগ্ম মহাসচিব সঞ্জয় গুপ্ত এবং পূজা উদযাপন ফ্রন্টের বিপ্লব কুমার পালসহ সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ। এ সময় ঢাকায় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার এবং নৌ পুলিশের পুলিশ সুপাররা ভার্চুয়ালি সভায় যুক্ত হন।
প্রায় ৩৩ হাজার পূজামণ্ডপে উৎসব
উল্লেখ্য, এ বছর দেশে প্রায় ৩৩ হাজার পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। এত বিপুলসংখ্যক পূজামণ্ডপে উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি আয়োজক, স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় জনগণ ও বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা, গুজব প্রতিরোধ, পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার মধ্য দিয়ে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ দুর্গোৎসব উদযাপনের প্রত্যাশা করছে পুলিশ প্রশাসন।







