দেড় লাখ রোহিঙ্গা শিশু শিক্ষার বাইরে, তহবিল সংকটে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

কক্সবাজার ও ভাসানচরের শিক্ষাকেন্দ্রগুলো চাপে, শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ের ঝুঁকি বাড়ছে; প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে অনেক শিশু

টুইট ডেস্ক: কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ ও ভাসানচরের শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষাজীবন গভীর সংকটে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি, জরাজীর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র ও সামাজিক বাধার কারণে অন্তত দেড় লাখ শিশু সহায়তাপ্রাপ্ত শিক্ষার বাইরে রয়েছে। এতে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শরণার্থী শিবিরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে প্রায় চার লাখ শিশু স্কুলগামী। তবে ২০২৫ সালের জুনে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) সতর্ক করেছিল, অর্থসংকটের কারণে প্রায় দুই লাখ ৩০ হাজার শিশুর শিক্ষা ঝুঁকিতে রয়েছে। সংস্থাটির সহায়তাপ্রাপ্ত শিক্ষাকেন্দ্রে পড়া শিশুদের বড় একটি অংশ এই সংকটের প্রভাবের মুখে পড়ে।

শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে অর্থসংকট

শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে অনেক কেন্দ্রে পুরোনো বই ব্যবহার করা হচ্ছে। সংকুচিত পাঠ্যসূচি ও স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকদের সহায়তায় চলছে পাঠদান। শিবিরের দুই হাজার ৫১টি শিক্ষাকেন্দ্রের মধ্যে ৬৫৪টির মেরামত প্রয়োজন হলেও বাজেটের অভাবে সবগুলো সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। জরাজীর্ণ অবকাঠামো শিশুদের নিরাপদে পড়াশোনার সুযোগকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

তবে সংকটের মধ্যেও কিছু অগ্রগতি রয়েছে। বর্তমানে তিন লাখের বেশি শিক্ষার্থী বিভিন্ন শিক্ষাকার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে। তাদের মধ্যে মেয়েশিশুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করছে বহু শিশু। প্রথমবারের মতো ৪৭ জন শিক্ষার্থীর দ্বাদশ শ্রেণি সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মেয়েশিশুদের পড়াশোনায় সামাজিক বাধা

বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পর রোহিঙ্গা মেয়েদের শিক্ষাজীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। পারিবারিক অনীহা, সামাজিক হয়রানি, শিক্ষাকেন্দ্রের দূরত্ব ও রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে অনেকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

শিবিরের কিশোরী রাজুমা সহশিক্ষা কার্যক্রমের কারণে সামাজিক বাধার মুখে পড়াশোনা বন্ধ করেছিল। পরে মেয়েদের জন্য আলাদা শ্রেণি বা পালার ব্যবস্থা করা হলে সে আবার পড়াশোনায় ফিরে আসে। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, মেয়েদের শিক্ষায় ধরে রাখতে নিরাপদ ও সামাজিক বাস্তবতার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

অন্যদিকে, সালমা ও মেহেরজানের মতো অনেক কিশোরী প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাছে শিক্ষাকেন্দ্র শুধু পাঠ গ্রহণের জায়গা নয়, বরং সহপাঠীদের সঙ্গে মেলামেশা, নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি চর্চা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার সুযোগ।

শিশুশ্রম ও সুরক্ষাঝুঁকি বাড়ছে

শিক্ষার বাইরে থাকা শিশুদের একটি অংশ দারিদ্র্যের কারণে শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি বাল্যবিয়ে, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অপহরণ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে পরিচালিত যৌথ সুরক্ষা পর্যবেক্ষণে শিবিরের ৩৩টি এলাকাতেই শিশুদের নানা ধরনের ঝুঁকির তথ্য উঠে এসেছে। ১৮১ শিশুকে নিয়ে ১৬টি দলীয় আলোচনায় প্রায় ৭২ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, শিবিরে শিশুশ্রম একটি সাধারণ ঘটনা। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানো, দারিদ্র্য ও শিক্ষার সুযোগের অভাব এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত শিশুদের অধিকার লঙ্ঘনের এক হাজার ৪৩৯টি গুরুতর ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঘটনার শিকার হয়েছে অন্তত এক হাজার ৬৪৫ শিশু।

ইতিবাচক অভিভাবকত্বে পরিবর্তনের আশা

সংকটের মধ্যেও অভিভাবকদের সচেতন করতে ইতিবাচক সন্তান লালন-পালন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ইউনিসেফ ও সহযোগী সংস্থাগুলোর উদ্যোগে প্রায় ২৮ হাজার অভিভাবক, পরিচর্যাকারী এবং সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা এ কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন।

এ উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, মারধর এড়িয়ে চলা, তাদের অনুভূতি বোঝা এবং শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানো, বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিক এবং শিশুদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিয়েও অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

কিছু পরিবারে বাবারাও মেয়েদের শিক্ষার পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন। শিবিরের কয়েকজন অভিভাবক সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে কন্যাসন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। তাঁদের উদ্যোগ অন্য পরিবারগুলোর জন্যও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে।

মানসিক স্বাস্থ্য ও দুর্যোগের প্রভাব

শরণার্থী শিবিরের অনিশ্চিত জীবন, সহিংসতার ভয়, অপহরণ, পারিবারিক বিচ্ছেদ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়নের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ২১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ তীব্র মানসিক চাপে ভুগছেন।

বর্ষাকালে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও শিশুদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এসব সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও শিশু সুরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিশু ও পরিচর্যাকারীদের জন্য মনোসামাজিক সহায়তা কার্যক্রমও চলছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান

অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশ্লেষক আসিফ মুনীরের মতে, রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার বাইরে থাকার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁদের দ্রুত আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অর্থায়ন বাড়ানো জরুরি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়া সরকার ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, পানি, স্যানিটেশন ও সুরক্ষাসেবা চালু রাখতে ইউনিসেফকে এক কোটি ১৪ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে ২০২৬ সালেও সংস্থাটির অর্থায়নে বড় ঘাটতি রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহায়তা, নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ এবং শিশু সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন। রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করাও জরুরি।