তারাগঞ্জ হাসপাতালের কা‌ছেই বর্জ্যের পাহাড়, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে

মহাসড়কের পাশে ‘মশা তৈরির কারখানা’, নীরব প্রশাসন। হাসপাতাল-উপজেলা পরিষদের পাশেই বছরের পর বছর বর্জ্যের স্তূপ, বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশঝুঁকি।

নিজস্ব প্রতিনিধি, তারাগঞ্জ (রংপুর): রংপুর–সৈয়দপুর মহাসড়কের পাশে দিনের পর দিন জমছে কাগজ, পলিথিন, প্লাস্টিক, ভাঙা লোহা, টিন, তার ও বিভিন্ন ধাতব বর্জ্য। মহাসড়কের পাশে এটি এখন যেন ‘মশা তৈরির কারখানা’।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর এলাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও উপজেলা পরিষদের মাঝামাঝি স্থানে বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে এসব বর্জ্যের স্তূপ। স্থানীয়দের ভাষায়, মহাসড়কের পাশে এটি এখন যেন ‘মশা তৈরির কারখানা’।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্য জায়গায় ভাঙারি মালামাল সংগ্রহ, স্তূপ করে রাখা ও কেনাবেচা চললেও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক ও ভ্যানযোগে পুরোনো কাগজ, পলিথিন, প্লাস্টিক, লোহা, টিন, তারসহ নানা ধরনের পরিত্যক্ত সামগ্রী এনে এখানে জমা করা হয়। পরে সেগুলো বাছাই করে বিক্রি করা হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বর্জ্যের স্তূপটি কোনো ঘনবসতিহীন দূরবর্তী এলাকায় নয়—উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও উপজেলা পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার কাছাকাছি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে বছরের পর বছর ধরে এমন পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম কীভাবে চলতে পারে?

স্থানীয়দের অভিযোগ, খোলা জায়গায় জমে থাকা পলিথিন ও প্লাস্টিকের স্তূপে বৃষ্টির পানি আটকে থাকে। এসব জমে থাকা পানিতে মশার প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি পচা ও ময়লা-আবর্জনা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বর্জ্যের ফাঁকে মাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গের উপদ্রবও বাড়ছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, সময়মতো এসব বর্জ্য অপসারণ না করা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের জমি ও জলাশয়েও। এতে কৃষিজমি, পানি ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় ভ্যানচালক জয়নাল বলেন, “বাতাসে প্লাস্টিকের টুকরা ও ধাতব কণা উড়ে আসে। অনেক সময় চলাচলের সময় চোখে-মুখেও লাগে। দ্রুত এসব বর্জ্য সরানো না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।”

এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, ভাঙারি মালামালের আড়ালে চোরাই বা সন্দেহজনক মালামাল কেনাবেচা হচ্ছে কি না, সেটিও যথাযথভাবে নজরদারি করা হচ্ছে না। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, বাইরের এলাকা থেকে বিভিন্ন ধরনের মালামাল এনে এখানে দ্রুত বিক্রি করে দেওয়া হয়।

তবে চোরাই বা সন্দেহজনক মালামাল কেনাবেচার অভিযোগের কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

‘দেখেও না দেখার ভাব’—ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। দিনের পর দিন চোখের সামনে বর্জ্যের স্তূপ বড় হচ্ছে, অথচ জায়গাটি পরিষ্কার করা বা ভাঙারি ব্যবসার বৈধতা যাচাইয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার প্রশ্ন—উপজেলা পরিষদ ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মতো সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশে যদি এভাবে বর্জ্য জমতে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখার দায়িত্ব কার?

তাদের অভিযোগ, “প্রশাসনের যেন কোনো গরজই নেই। সব দেখেও না দেখার ভাব।”

এলাকাবাসীর দাবি, বিষয়টি আর কেবল ময়লা-আবর্জনার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, সড়কের নিরাপত্তা এবং ভাঙারি ব্যবসার বৈধতার প্রশ্নও জড়িত।

তারা দ্রুত ওই এলাকার বর্জ্যের স্তূপ অপসারণ, জায়গাটির পরিবেশগত ঝুঁকি নিরূপণ, মশা-মাছির প্রজননস্থল ধ্বংস, ভাঙারি ব্যবসার বৈধতা যাচাই এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত অভিযান পরিচালনারও দাবি উঠেছে।

কারণ, হাসপাতালের পাশে যদি বর্জ্যের স্তূপ দিনের পর দিন পড়ে থাকে এবং সেই বর্জ্যই যদি মশা-মাছির প্রজননস্থলে পরিণত হয়, তাহলে জনস্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।