৮২ কোটি টাকার শান্তিনিবাস, থাকেন না কোনো প্রবীণ

তিন বছর আগে উদ্বোধন হলেও জনবল ও বরাদ্দের অভাবে আটটি নিবাস পড়ে আছে; নষ্ট হচ্ছে ভবন ও আসবাব।

টুইট প্রতিবেদক: অসহায়, পরিত্যক্ত ও আশ্রয়হীন প্রবীণদের নিরাপদ আবাসনের জন্য দেশের আট জেলায় নির্মাণ করা হয়েছিল আটটি শান্তিনিবাস। প্রায় ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব ভবনে থাকার কথা ছিল ২০০ প্রবীণের। কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পরও একটি নিবাসেও কোনো প্রবীণের আবাসন নিশ্চিত হয়নি।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের উদ্যোগে নির্মিত এসব নিবাসে আধুনিক আবাসন, চিকিৎসা, বিনোদন, শরীরচর্চা ও প্রার্থনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অথচ জনবল নিয়োগ ও পরিচালন ব্যয় অনুমোদন না হওয়ায় ভবনগুলো কার্যত তালাবদ্ধ। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় কোথাও আসবাবে ধুলা জমছে, কোথাও দেয়ালে শেওলা ধরেছে, আবার কোথাও রেলিংয়ে মরিচা পড়েছে।

২০২০ সালের জুলাইয়ে আটটি শান্তিনিবাস নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৭৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়াদ বাড়ানো হয়। সংশোধিত হিসাবে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৮২ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর আটটি নিবাস আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।

গোপালগঞ্জ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালীর চারটি নিবাসে শুধু নারী প্রবীণদের থাকার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অন্য চারটি,ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালে,পুরুষ প্রবীণদের জন্য ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি নিবাসে ২৫ জন করে মোট ২০০ জন প্রবীণের থাকার সুযোগ রয়েছে।

দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

প্রবীণদের জন্য নির্মিত এসব ভবনে লিফট, অভ্যর্থনা কক্ষ, দর্শনার্থী কক্ষ, শয্যাকক্ষ, স্বাস্থ্যসেবা কক্ষ, বিনোদন ও শরীরচর্চার স্থান, প্রার্থনাকক্ষ, প্রশিক্ষণ কক্ষসহ বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। কিন্তু ব্যবহারের অভাবে এসব সরঞ্জামও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বরিশালের শান্তিনিবাসে ভবনের মেঝে, সিঁড়ি ও বারান্দায় ধুলা জমেছে। শরীরচর্চার সরঞ্জাম ও আসবাব পড়ে আছে। লিফটও চালু হয়নি। খুলনায় দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় সিঁড়ি ও দেয়ালে শেওলা এবং রেলিংয়ে মরিচা দেখা দিয়েছে। সেখানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলোর মেয়াদও পেরিয়ে গেছে।

ময়মনসিংহের শান্তিনিবাসে বৃষ্টির পানি ঢুকে আসবাবপত্র নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। রাজশাহীর নিবাসের কক্ষগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। গোপালগঞ্জে ব্যবহার না হওয়া কক্ষগুলো অপরিচ্ছন্ন। সুনামগঞ্জে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় আসবাব নষ্ট হচ্ছে এবং পানির পাম্প অচল হয়ে আছে।

লালমনিরহাটের শান্তিনিবাসের বৈদ্যুতিক সংযোগ বিল বকেয়া থাকায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে। লিফটের রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়েছে। নোয়াখালীতে ২০২৪ সালের বন্যায় শিশু পরিবারের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে থাকা শিশু-কিশোরীদের সাময়িকভাবে শান্তিনিবাসে রাখা হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা ভবনটির নির্মাণমান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আটটি শান্তিনিবাস চালু না হওয়ার প্রধান কারণ জনবল ও পরিচালন বাজেটের ঘাটতি। প্রতিটি নিবাস পরিচালনায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৫ জন জনবল প্রয়োজন হবে। চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্‌বুব জানিয়েছেন, জনবল না থাকায় এতদিন শান্তিনিবাসগুলো চালু করা যায়নি। গত মাসে আটটি নিবাসের জন্য জনবল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অক্টোবরের মধ্যে এগুলো চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল পরীক্ষামূলকভাবে আটটি শান্তিনিবাস চালুর পর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশের অন্যান্য জেলাতেও প্রবীণদের জন্য এমন আবাসন গড়ে তোলা। কিন্তু প্রথম ধাপের প্রকল্পই দীর্ঘ সময় ধরে অব্যবহৃত থাকায় সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’। এমন দিনে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত প্রবীণ নিবাসগুলোর অব্যবহৃত পড়ে থাকার বিষয়টি প্রবীণদের আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র সামনে এনেছে।

লালমনিরহাটের সত্তরোর্ধ্ব আছিয়া খাতুনের মতো অনেক প্রবীণ এখনো স্থায়ী ও নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁর মতো মানুষের জন্য নির্মিত ভবন প্রস্তুত থাকলেও সেটি ব্যবহারযোগ্য না হওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ,জনবল, অর্থায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার গুরুত্বই স্পষ্ট করে।