হামে মৃত্যু ১১০৪, দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি

গণটিকাদানের পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু না কমায় উদ্বেগ; টিকাদান ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ জনস্বাস্থ্যবিদদের।
টুইট প্রতিবেদক: বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে হামে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৪। দেশের ইতিহাসে হামে এত মৃত্যু ও সংক্রমণের নজির নেই বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, এ পর্যন্ত হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৯০ হাজার ৫১০ জন। সরাসরি হামে আক্রান্ত হয়েছেন ২১ হাজার ৩৯২ জন। সব মিলিয়ে হামের রোগী ও উপসর্গযুক্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৯০২।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায় সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যানেও। ২০২৫ সালে দেশে হাম রোগী ছিল মাত্র ১৩২ জন। ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২ এবং ২০২২ সালে ৩১১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। এর বিপরীতে চলতি বছরে সংক্রমণ কয়েক লাখে পৌঁছেছে।
টিকাদানে ঘাটতিই বড় কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক বছর ধরে নিয়মিত টিকাদানের আওতা কমে যাওয়া এবং টিকা সরবরাহে ঘাটতি হামের নতুন করে বিস্তারের অন্যতম কারণ। ২০২০-২১ সালের পর বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি আর হয়নি। একই সময়ে নিয়মিত টিকাদানের হারও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে এ হার ৫৯ শতাংশে নেমে যায়।
এর আগে জাতীয় পর্যায়ে হাম প্রতিরোধে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছিল। ২০১০ সালের একটি বিশেষ কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল এবং তা পুরোপুরি অর্জিত হয়। ২০১৪ সালের হাম-রুবেলা কর্মসূচিতেও ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
জাতিসংঘ শিশু তহবিলের বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া এর আগে জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এতে টিকা সরবরাহে বিলম্ব হতে পারে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে।
বিশ্বে সংক্রমণের শীর্ষে বাংলাদেশ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে হাম বা হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে ৪২ হাজার ১৭৪ জন। ওই সময়ে বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এত রোগী পাওয়া যায়নি।
তালিকায় বাংলাদেশের পর রয়েছে ভারত। সেখানে একই সময়ে হামের উপসর্গযুক্ত রোগী ছিল ২৬ হাজার ৬০৭ জন। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইয়েমেনে রোগীর সংখ্যা ১৪ হাজার ৫২১।
তবে জুলাইয়ের পরও বাংলাদেশে সংক্রমণ কমেনি। বরং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেড়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, এত ব্যাপক সংক্রমণ বাংলাদেশের জন্য নজিরবিহীন।
গণটিকাদানেও বাদ পড়েছে লাখো শিশু
সংক্রমণ তীব্র হওয়ার পর চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। কিন্তু লক্ষ্য নির্ধারণে বড় ধরনের ব্যবধান থাকায় প্রায় ৪৬ লাখ শিশু ওই কর্মসূচির আওতার বাইরে থেকে যায় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
হামের টিকার জন্য এ বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে হিসাব করা হলেও, এর কিছুদিন পর ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচিতে একই বয়সী প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু হাম প্রতিরোধের টিকার বাইরে থেকে যাওয়ার বিষয়টি জনস্বাস্থ্যবিদদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ছিল, বাদ পড়া শিশুরা নিজেরা যেমন সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকবে, তেমনি তাদের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। গণটিকাদানের কয়েক মাস পরও মৃত্যু ও সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় সেই উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
এক পরিবারে দুই শিশুর মৃত্যু হামের ভয়াবহতার একটি উদাহরণ বান্দরবানের রুমা উপজেলার লেংটংপাড়ার একটি পরিবার। খুমি জাতিগোষ্ঠীর তৈসাং ও নাংয়ো খুমি দম্পতির দুই ছেলে,চার বছর বয়সী প্রেলং খুমি ও সাত বছর বয়সী খ্রেতং খুমি,হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায়।
২৫ জুলাই খ্রেতং এবং দুই দিন পর ২৭ জুলাই প্রেলংয়ের মৃত্যু হয়। দুই শিশুকে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়। তাঁদের আরও দুই সন্তান বর্তমানে চিকিৎসাধীন।
এমন আরও বহু পরিবারের সন্তান হারানোর ঘটনা এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সামনে আসছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু একটি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার নানা ঘাটতির প্রতিফলন।
দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি
হামের এমন ভয়াবহ বিস্তারের পেছনে কী কী কারণ কাজ করেছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। তাঁদের বক্তব্য, টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ, নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি, আক্রান্তদের চিকিৎসা এবং গণটিকাদান কর্মসূচির আওতাভুক্তির মতো বিষয়গুলো আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেনের মতে, টিকা ও চিকিৎসা দুই ক্ষেত্রেই অবহেলার অভিযোগ খতিয়ে দেখা দরকার এবং এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে।
আরেক জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদও হামের পরিস্থিতির নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানে কার্যকর তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, শুধু তদন্তের কথা বললেই হবে না; কী কারণে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হলো, তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বের করে ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে টিকাদানের ঘাটতি, টিকা সরবরাহের সমস্যা, বাদ পড়া শিশু এবং সংক্রমণের সময় যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এখন সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকানোর পাশাপাশি হামের এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির কারণ অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করাই বড় চ্যালেঞ্জ।






