ছাত্র আন্দোলনে চাপের মুখে পদত্যাগ করলেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ভুচিচ

২৫ অক্টোবর সংসদ নির্বাচন, এরপর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন; প্রধানমন্ত্রীর পদে লড়বেন ভুচিচ

টুইট ডেস্ক: প্রায় দুই বছর ধরে চলা ছাত্র-নেতৃত্বাধীন সরকারবিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগের সময় বেলগ্রেডের প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে ভুচিচের শত শত সমর্থক জড়ো হন। তাঁরা পতাকা ওড়ান এবং তাঁর পক্ষে স্লোগান দেন।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানী বেলগ্রেডে প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তাঁর পদত্যাগের ফলে নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাত মাস আগেই দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পথ খুলে গেল।

পদত্যাগের আগে সমর্থকদের উদ্দেশে ভুচিচ বলেন, ওই ভবনে সেটিই ছিল তাঁর শেষ সন্ধ্যা। তিনি তাঁর প্রায় ১২ বছরের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, তিনি সার্বিয়া ও দেশের জনগণের জন্য দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এ সময়ে অর্জিত বিভিন্ন সাফল্যের জন্য গর্বিত। তিনি ২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী অথবা প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশটির রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

ভুচিচের পদত্যাগের সঙ্গে আগামী ২৫ অক্টোবরের আগাম সংসদ নির্বাচনও নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) নির্বাচনে সরকার গঠন করতে পারলে ভুচিচ প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পাবেন। সংবিধান অনুযায়ী তিনি তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে পারবেন না।

রেলস্টেশনের ছাদ ধসের পর আন্দোলনের সূত্রপাত

ভুচিচ সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ শহরের রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর। ওই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি, জবাবদিহি ও সরকারি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহির দাবি তোলেন। পরে আন্দোলনটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারের বিরুদ্ধে আগাম নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিও সামনে আসে।

ছাত্রদের পাশাপাশি শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও আন্দোলনে যুক্ত হন। দীর্ঘ সময় ধরে বিক্ষোভ চলতে থাকে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ও আটকের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভুচিচ ও তাঁর মিত্রদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগ তুলেছে; তবে সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ভুচিচের সরকার ও তাঁর দল দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করার অভিযোগের মুখে পড়েছে। ক্ষমতাসীন দল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করার কথা বলে আসছে।

দুই দফায় ভোট

সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট পদ শূন্য হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। ভুচিচ জানিয়েছেন, আগামী ২৫ অক্টোবর সংসদ নির্বাচন হবে এবং বছরের শেষ নাগাদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা অনুষ্ঠিত হতে পারে। ফলে চলতি বছরেই সার্বিয়ার জনগণ সংসদ ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদের স্পিকার আনা ব্রনাবিচ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি ভুচিচের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী এবং সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির শীর্ষ নেতা। নতুন সংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদের নতুন স্পিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখবেন।

ছাত্র আন্দোলন এবার নির্বাচনী লড়াইয়ে

সাম্প্রতিক দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের সমর্থিত একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এবার নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সমর্থিত তালিকায় বিভিন্ন পেশার বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক, শিক্ষক, ক্রীড়াবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ থাকার কথা জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী বিরোধী রাজনৈতিক জোট ও অন্যান্য ছোট দলও ২৫ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। ফলে নির্বাচনটি ভুচিচের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাব এবং ছাত্র-সমর্থিত নতুন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে বড় ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ইইউতে যোগদানের চেষ্টা

ভুচিচ দীর্ঘদিন ধরে সার্বিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য করার কথা বলে আসছেন। একই সময়ে তাঁর সরকার রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং চীনা বিনিয়োগের জন্যও দেশটি উন্মুক্ত রেখেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রশ্নেও সার্বিয়ার অবস্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি।

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৭ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ভুচিচ। পরে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাঁর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সার্বিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের ভুচিচ-পর্ব নতুন নির্বাচনী পর্যায়ে প্রবেশ করল।

রোববার পদত্যাগের সময় বেলগ্রেডের প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে ভুচিচের শত শত সমর্থক জড়ো হন। তাঁরা পতাকা ওড়ান এবং তাঁর পক্ষে স্লোগান দেন। অন্যদিকে প্রায় দুই বছর ধরে চলা ছাত্র আন্দোলন ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে আসছে।

সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, আল জাজিরা, এএফপি ও সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।