ওমেগা-৩ খেলেই কি বাড়বে স্মৃতিশক্তি?

শরীরে ওমেগা-৩-এর মাত্রা বাড়লেও স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞানীয় সক্ষমতা বাড়ার নিশ্চয়তা নেই।
টুইট প্রতিবেদক: স্মৃতিশক্তি ভালো রাখা এবং ভবিষ্যতে আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে অনেকেই নিয়মিত ওমেগা-৩-এর বড়ি সেবন করেন।
মাছের তেল বা শৈবাল থেকে তৈরি ওমেগা-৩ বড়িকেও অনেকে মস্তিষ্কের সুস্থতার সহজ উপায় মনে করেন। তবে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরে ওমেগা-৩-এর মাত্রা বাড়লেও শুধু বড়ি সেবনের মাধ্যমে স্মৃতিশক্তি
জ্ঞানীয় সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি নাও হতে পারে।
গবেষণায় ৫৫ থেকে ৮০ বছর বয়সী ৩৬৫ জন মানুষ অংশ নেন। তাঁদের কারও ডিমেনশিয়া ছিল না। তবে সবার শরীরে ওমেগা-৩-এর মাত্রা কম ছিল এবং স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ রক্তে চর্বি বা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো অন্তত একটি ঝুঁকি ছিল।
অংশগ্রহণকারীদের একদলকে টানা ২৪ মাস প্রতিদিন উচ্চমাত্রার শৈবালভিত্তিক ওমেগা-৩ দেওয়া হয়। অন্যদলকে দেওয়া হয় নিষ্ক্রিয় বড়ি। গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের রক্ত পরীক্ষা, মস্তিষ্কের চৌম্বকীয় অনুরণন চিত্র এবং জ্ঞানীয় সক্ষমতার পরীক্ষা করা হয়।
শরীরে বাড়ল ওমেগা-৩, কিন্তু বাড়েনি স্মৃতিশক্তি
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ওমেগা-৩ গ্রহণকারীদের শরীরে এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর চারপাশের তরল পদার্থেও ডিএইচএ-এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ গ্রহণ করা ওমেগা-৩ শরীরে শোষিত হয়ে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছেছিল।
তবে এর পরও স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞানীয় সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি। এমনকি স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশ হিপোক্যাম্পাসের আয়তনেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পাওয়া যায়নি।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার স্নায়ুবিজ্ঞান অধ্যাপক হুসেইন ইয়াসিনের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু শরীরে ওমেগা-৩-এর মাত্রা বাড়ানোই মস্তিষ্কের কার্যকারিতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার জন্য যথেষ্ট নয়।
তাহলে কি ওমেগা-৩ প্রয়োজন নেই?
বিষয়টি এমন নয়। ওমেগা-৩ শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। মস্তিষ্ক, চোখ, হৃদ্যন্ত্র এবং কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে এর ভূমিকা রয়েছে।
ওমেগা-৩-এর গুরুত্বপূর্ণ ধরনগুলোর মধ্যে ইপিএ ও ডিএইচএ রয়েছে। চর্বিযুক্ত মাছ এসব উপাদানের ভালো উৎস। স্যামন, সার্ডিন, ম্যাকারেল ও হেরিংয়ের মতো মাছে ওমেগা-৩ পাওয়া যায়। অন্যদিকে আখরোট, চিয়া বীজ ও তিসি বীজে পাওয়া যায় এএলএ।
তবে খাবার থেকে ওমেগা-৩ গ্রহণ এবং শুধু বড়ি সেবনকে একইভাবে দেখা ঠিক নয়। কারণ মাছ, বাদাম ও বীজে ওমেগা-৩ ছাড়াও আরও বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে।
শুধু বড়ির ওপর নির্ভর না করার পরামর্শ
মস্তিষ্কের সুস্থতা ধরে রাখতে একটি নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক জীবনযাপনের দিকে নজর দেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং কম প্রক্রিয়াজাত খাবারভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যতালিকায় চর্বিযুক্ত মাছ, বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের বীজ রাখাও উপকারী হতে পারে।
আলঝেইমার প্রতিরোধবিষয়ক গবেষক রিচার্ড আইজ্যাকসনের মতে, মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য ওমেগা-৩ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সামগ্রিক জীবনযাপন ঠিক না থাকলে শুধু বড়ির ওপর নির্ভর করে বড় ধরনের সুফল আশা করা ঠিক নয়।
বিশেষ করে যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন না, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খান কিংবা অতিরিক্ত ওজন ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে শুধু ওমেগা-৩ বড়ি গ্রহণ করলেই মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে বড় পরিবর্তন আসবে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মাছ, আখরোট নাকি চিয়া বীজ?
খাবার থেকেই ওমেগা-৩ পাওয়ার বেশ কিছু সহজ উৎস রয়েছে। চর্বিযুক্ত মাছ ইপিএ ও ডিএইচএ-এর ভালো উৎস। অন্যদিকে চিয়া বীজ, তিসি বীজ ও আখরোটে পাওয়া যায় এএলএ।
আখরোটে ওমেগা-৩-এর পাশাপাশি ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, তামা ও ভিটামিন বি৬-এর মতো বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানও রয়েছে। ফলে সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে এসব খাবার রাখা যেতে পারে।
সার্বিকভাবে নতুন গবেষণার বার্তা হলো,শরীরে ওমেগা-৩-এর মাত্রা বাড়লেই স্মৃতিশক্তি বা জ্ঞানীয় ক্ষমতা বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য শুধু বড়ির ওপর নির্ভর না করে সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়াই জরুরি।






