পোশাক খাতে বড় ধাক্কা, তিন বছরে বন্ধ ৫৩৪ কারখানা

বন্ধ কারখানায় কাজ হারিয়েছেন প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক, সংকটে সচল অনেক প্রতিষ্ঠানও
টুইট ডেস্ক: বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ সংকট, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে দেশের তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশে ৫৩৪টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানায় কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ২ লাখ ৭৯ হাজার ২৫২ শ্রমিক।
খাতসংশ্লিষ্ট দুই সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি এবং বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে ২০২৫ সালে। ওই এক বছরেই ২৬৪টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং কাজ হারান ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৪ শ্রমিক।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে ৫১ হাজার ৩৪৭ শ্রমিক কর্মসংস্থান হারান। একই বছর নতুন ১৭১টি কারখানা চালু হয়ে কর্মসংস্থান হয় ৬৬ হাজার ৩৯৯ জনের। ২০২৪ সালে বন্ধ হয় আরও ১০০টি কারখানা এবং কর্মসংস্থান হারান ৫৫ হাজার ৩৭৭ শ্রমিক। ওই বছর নতুন ১৩১টি কারখানায় কর্মসংস্থান হয় ৬৪ হাজার ৫১৬ জনের।
২০২৫ সালে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। ওই বছর ২৬৪টি কারখানা বন্ধের বিপরীতে নতুন করে চালু হয় ১৫০টি। বন্ধ কারখানাগুলোয় কর্মরত ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৪ শ্রমিক কাজ হারান। নতুন কারখানাগুলোয় কর্মসংস্থান হয় ৭৬ হাজার ৪৭৯ জনের।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তাদের ২৮৭টি সদস্য কারখানা বন্ধ হয়েছে। বিপরীতে নতুন চালু হয়েছে ৩৭১টি। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই বন্ধ হয়েছে ১৬৮টি কারখানা।
অন্যদিকে বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির ২৪৭টি সদস্য কারখানা একই সময়ে বন্ধ হয়েছে। বিপরীতে নতুন চালু হয়েছে ১৮৭টি। এ খাতেও ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ৯৬টি কারখানা বন্ধ হয়।
সংগঠন দুটির নেতারা বলছেন, কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে তারল্যসংকট, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি ও গ্যাসের সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, শ্রমিক অসন্তোষ, নীতি পরিবর্তন, কর ও মূল্য সংযোজন করের জটিলতাও প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে কারখানা বন্ধ হয়েছে। তাঁর মতে, সংকট মোকাবিলায় বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, নীতির স্থিতিশীলতা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত কয়েক বছরে সংকটের কারণে অসংখ্য কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং বিনিয়োগ কমেছে। সচল অনেক কারখানাও লোকসানে চলছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো চাপে রয়েছে। এ খাতকে টিকিয়ে রাখতে একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকাশিত পরিসংখ্যানের চেয়েও প্রকৃত পরিস্থিতি আরও নাজুক হতে পারে। বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের মতে, নতুন কারখানা হিসেবে নিবন্ধিত সব প্রতিষ্ঠান প্রকৃত অর্থে নতুন বিনিয়োগের ফল নয়। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পর বিদ্যমান যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নতুন নামে কার্যক্রম শুরু করা হয়।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি রপ্তানি প্রতিযোগিতায়ও চাপ বাড়ছে। কাঁচামালের মূল্য, জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত জ্বালানি সংকটের সমাধান এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করা, পণ্য পরিবহনে সময় কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।






