জাতিসংঘের হিসাবে ক্ষমতার টেবিলে নারীরা পিছিয়ে

বিশ্বে রাজনৈতিক ও শান্তি নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। বিশ্বে নারী নেতৃত্বাধীন দেশ মাত্র ২৮টি, শান্তি আলোচনায় নারী আলোচক গড়ে ৭ শতাংশ।

টুইট ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শান্তি আলোচনায় নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে—নারীর নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তব চিত্র এখনো সেই প্রত্যাশার অনেক নিচে।

২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে মাত্র ২৮টি দেশ নারী রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে রয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বের প্রায় প্রতি সাতটি দেশের মধ্যে মাত্র একটি দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী নেতৃত্বে একজন নারী রয়েছেন। একই সময়ে ১০১টি দেশ এখনো কোনো নারীকে রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে পায়নি। তথ্যটি জাতিসংঘ নারী ও আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়নের যৌথ Women in Politics 2026 প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।

রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যান্য স্তরেও নারীর প্রতিনিধিত্ব সীমিত। বিশ্বব্যাপী মন্ত্রিসভায় নারীর অংশ ২২ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের ২৩ দশমিক ৩ শতাংশের তুলনায় কম। অন্যদিকে জাতীয় সংসদগুলোতে নারীর প্রতিনিধিত্ব ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি ২৭ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে—২০২৫ সালের ২৭ দশমিক ২ শতাংশের তুলনায় মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধি।

সংসদীয় নেতৃত্বেও একই ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্বে সংসদের সভাপতিত্বকারী নারীর সংখ্যা ছিল ৫৪ জন, যা মোট সংসদীয় সভাপতির মাত্র ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে নির্বাচিত বা নিয়োগ পাওয়া ৭৫ জন নতুন স্পিকারের মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ১২ জন।

শুধু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানেই নয়, যুদ্ধ ও সংঘাত নিরসনের আনুষ্ঠানিক আলোচনাতেও নারীর উপস্থিতি অত্যন্ত কম। জাতিসংঘ নারী-এর ২০২৫ সালের Women and Peace and Security সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের বৈশ্বিক তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, বড় শান্তি প্রক্রিয়াগুলোতে গড়ে মাত্র ৭ শতাংশ আলোচক বা negotiator ছিলেন নারী। মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে নারীর হার ছিল ১৪ শতাংশ এবং শান্তিচুক্তির স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ২০ শতাংশ।

জাতিসংঘ নারী বলছে, এসব বৈশ্বিক গড়ের ওপর কলম্বিয়া ও ফিলিপাইনের মতো কয়েকটি শান্তি প্রক্রিয়ার তুলনামূলক বেশি নারী অংশগ্রহণের প্রভাব রয়েছে। অর্থাৎ অধিকাংশ শান্তি আলোচনায় বাস্তব অংশগ্রহণ আরও সীমিত হতে পারে। জাতিসংঘের নির্ধারিত ন্যূনতম এক-তৃতীয়াংশ নারী অংশগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি এখনও অনেক পিছিয়ে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৩৬টি শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। এর মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশ চুক্তিতে নারী, কন্যাশিশু, লিঙ্গ বা যৌন সহিংসতা নিয়ে অন্তত একটি বিধান ছিল। একই বছরে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন বা সহ-নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রক্রিয়াগুলোতে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী নারীর সংখ্যা ছিল মাত্র দুইজন।

নারীর অংশগ্রহণ শান্তিচুক্তির স্থায়িত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানও সম্প্রতি এক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে বলেন, শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ চুক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করার সম্ভাবনা বাড়ায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ থাকলে কোনো শান্তিচুক্তি অন্তত দুই বছর টিকে থাকার সম্ভাবনা ২০ শতাংশ বাড়ে এবং সংঘাত ফিরে আসার ঝুঁকি ৩৭ শতাংশ কমে।

ড. খলিলুর রহমানের ৮১তম অধিবেশনের কর্মসূচিতে শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের পাশাপাশি নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর অগ্রাধিকারের প্রথম স্তম্ভের নাম—‘Silence the Guns, Amplify the Voices’। সেখানে সংঘাত প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সমাধান, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বেসামরিক জনগণের সুরক্ষার পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৩২৫ নম্বর প্রস্তাবের আওতায় নারীর ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

জাতিসংঘ নারী ও আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান তাই একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তুলে ধরে—নারীর রাজনৈতিক ও শান্তি নেতৃত্ব বাড়ানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহু অঙ্গীকার থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ টেবিলে তাদের উপস্থিতি এখনো সীমিত। রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শান্তি আলোচনা—দুই ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি এখনো বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

সূত্র: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, জাতিসংঘ নারী এবং আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়ন।