খুলনায়‘ভাত চুরির’ অভিযোগে শিক্ষার্থীর মৃত্যু: মেস সংস্কৃতিতে সহিংসতার ভয়াবহতা

অভিযোগ সত্য হলেও শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই; আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে প্রকৃত দায় নির্ধারণ জরুরি।
সংবাদ সম্পাদকীয় | টুইট ডেস্ক:
এক প্লেট ভাত খাওয়া নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত একজন তরুণ শিক্ষার্থীর প্রাণ কেড়ে নিল—খুলনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনা তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা নয়, বরং আবাসিক মেসে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ভয়াবহ পরিণতিরও উদাহরণ।
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে, ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলসংলগ্ন একটি মেসে ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে আজমুলের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরে তাঁকে মারধর করার অভিযোগ ওঠে। একপর্যায়ে তিনি ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করা হয়েছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কেউ খাবার চুরি করেছেন কি না, টাকা নিয়েছেন কি না কিংবা অন্য কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন কি না, তার বিচার করার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা মেসের সদস্যদের নেই। অভিযোগ থাকলে মেস কর্তৃপক্ষ, বাড়ির মালিক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোই ছিল আইনসম্মত পথ। কাউকে আটকে রাখা, মারধর করা, অপমান করা কিংবা জোর করে শাস্তি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ঘটনার আরেকটি দিকও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে ‘এক প্লেট ভাতের জন্য হত্যা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনাটির পূর্ণ কারণ, মারধরে কারা জড়িত ছিলেন এবং আজমুল কীভাবে ছাদ থেকে নিচে পড়লেন—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
আজমুলের মৃত্যু তাঁর পরিবার, সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। মাত্র কয়েক দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া একজন তরুণের জীবন এভাবে থেমে যাওয়া গভীরভাবে বেদনাদায়ক। একই সঙ্গে ঘটনাটি দেশের বিভিন্ন শিক্ষার্থী মেসের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিটি মেসে খাবারের হিসাব, টাকা-পয়সা কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। কিন্তু এসব সমস্যা সমাধানের পথ কখনোই শারীরিক নির্যাতন হতে পারে না। মেস মালিক ও পরিচালকদেরও দায়িত্ব রয়েছে—শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিরোধ দেখা দিলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা এবং কোনো ধরনের সহিংসতা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা।
আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় তাই প্রয়োজন দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। তিনি কীভাবে ছাদ থেকে পড়ে গেলেন, তাঁর ওপর কারা হামলা করেছিল, চুল কাটার ঘটনা কীভাবে ঘটেছে এবং ঘটনার আগে-পরে কী হয়েছিল—প্রতিটি বিষয় তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত না করে আদালত ও তদন্তের প্রক্রিয়াকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া উচিত।
এক প্লেট ভাতের মূল্য কোনো মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। অভিযোগের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে—সহিংসতার মাধ্যমে নয়।






