শিশু নিখোঁজ থেকে হত্যাকাণ্ড: অপরাধ দমনে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান জরুরি

সাত মাসে নিখোঁজের জিডি ১৫ হাজার ৭১৭, এখনো সন্ধান নেই ২ হাজার ৩৮ শিশুর; অপ্রতিমের মৃত্যুতে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
বদিউল আলম লিংকন: দেশে শিশু নিখোঁজ, নিখোঁজের পর মৃত্যু এবং দীর্ঘদিন সন্ধান না পাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। সন্তান হারিয়ে অসংখ্য পরিবার অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশায়েক শাহরিয়ার অপ্রতিম শুভ্র নিখোঁজ হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শিশু অপহরণ, পাচার, নির্যাতন কিংবা অপরাধীচক্রের হাতে পড়ার আশঙ্কা বিবেচনায় দ্রুত ও সমন্বিত তদন্তের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অবৈধ অস্ত্র ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সাত মাসে নিখোঁজ ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু
পুলিশ সদর দপ্তরের ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা পরিবারের কাছে ফিরেছে। এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ শিশুর।
শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি জিডির মধ্যে ৪০৬ জন উদ্ধার হলেও ৬৮ জনের সন্ধান মেলেনি। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ১৫ হাজার ২৪৩টি জিডি হয়েছে; ১৩ হাজার ২৭৩ জন উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফিরেছে এবং ১ হাজার ৯৭০ জন এখনো নিখোঁজ।
পুলিশ বলছে, বয়সভেদে নিখোঁজের কারণ ভিন্ন হতে পারে। ছোট শিশুরা পথ হারাতে পারে; কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে পারিবারিক বিরোধ, অভিমান, পড়াশোনার চাপ বা বন্ধুদের প্রভাবের মতো কারণও থাকতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত করা জরুরি।
অপ্রতিমের মৃত্যুতে নতুন প্রশ্ন
কুমিল্লায় মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়ে নিখোঁজ হয় ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম শুভ্র। ১৮ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হওয়ার পরদিন কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণ মোড়ের পাশের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল।
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনায় কারা জড়িত—তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নিখোঁজ শিশুদের পরিবারগুলোর কান্না
৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ‘জিরো মিসিং চিলড্রেন’ আয়োজিত ‘আমার সন্তান কোথায়?’ সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন এলাকার নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদনে প্রায় ৪০টি পরিবারের অংশ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ঝিনাইদহের খাজুরা গ্রামের হোসেন আলী তাঁর ১২ বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আলীর সন্ধান না পাওয়ার কথা জানান। তাঁর অভিযোগ, সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর জিডি করতে তাঁকে কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। পরে গোয়েন্দা শাখা ও পিবিআইয়ে বিষয়টি গেলেও সন্তানের সন্ধান মেলেনি বলে তিনি দাবি করেন।
প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও দ্রুত অনুসন্ধান
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন জিডি চালুর পর নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৩ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে জিডি ছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪টি এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০টি। তবে এসব বছরের মধ্যে কতজন শিশু ছিলেন এবং কতজন উদ্ধার হয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান একইভাবে প্রকাশিত হয়নি।
দীর্ঘদিন নিখোঁজ শিশুদের পৃথক তালিকা, নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ, দ্রুত অনুসন্ধান এবং উদ্ধার হওয়া শিশুদের পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অপারেশন ক্লিন হার্টের অভিজ্ঞতা
২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ পরিচালিত হয়। এতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, তৎকালীন বিডিআর, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা অংশ নেন। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযানে ১১ হাজার ২৪৫ জনকে গ্রেপ্তার এবং ২ হাজার ২৮টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২৯ হাজার ৭৫৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
অভিযানটি জননিরাপত্তা ও অপরাধ দমনে কার্যকর ভুমিকা রাখে। জনগণের ব্যাপক সমর্থন লাভ করে। তবে অন্যদিকে হেফাজতে মৃত্যু, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। ২০১৫ সালে হাইকোর্ট ‘জয়েন্ট ড্রাইভ ইনডেমনিটি অ্যাক্ট, ২০০৩’ অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। ফলে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যেকোনো অভিযানেই আইন, মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
শিশু নিখোঁজের কারণ এক নয়। কোনো শিশু পথ হারাতে পারে, কেউ পারিবারিক কারণে বাড়ি ছাড়তে পারে; আবার কোনো ঘটনায় অপহরণ বা পাচারের আশঙ্কাও থাকতে পারে। তাই প্রতিটি ঘটনার ধরন অনুযায়ী দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন।
নিখোঁজের জিডি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধান, থানাভিত্তিক তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয়, দীর্ঘদিন নিখোঁজ শিশুদের জন্য বিশেষ তদন্ত, সীমান্ত ও জনসমাগমস্থলে নজরদারি, আন্তজেলা ও আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং উদ্ধার হওয়া শিশুদের নিরাপদ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশই এখন সামনের সারির বাহিনী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। এ অবস্থায় শিশু নিখোঁজ, অপরাধ, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে পুলিশের উচিত হবে সরকারের কাছে একটি সমন্বিত যৌথ অভিযান পরিচালনার প্রস্তাব পাঠানো। সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক, আইনসম্মত ও জবাবদিহিমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে পুলিশ। এতে একদিকে অপরাধ দমন জোরদার হবে, অন্যদিকে জনগণের নিরাপত্তা ও পুলিশের প্রতি আস্থাও আরও সুদৃঢ় হতে পারে।
দেশের প্রতিটি মা-বাবার প্রত্যাশা—সন্তান নিরাপদে স্কুলে যাবে, খেলতে বের হবে এবং সুস্থভাবে ঘরে ফিরবে। তাই শিশু নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনা দ্রুত তদন্ত, পরিবারের পাশে রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ।






