১৩ বছরের অপ্রতিম আর ফিরবে না, কুবিতে ক্লাস পরীক্ষা স্থগিত

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে কাঁদছে কুবি, আজ রোববার শোক। মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বেরিয়ে আর ফেরা হলো না; জঙ্গল থেকে মিলল ১৩ বছরের অপ্রতিমের নিথর দেহ, আটক ৩।
নিজস্ব প্রতিবেদক: একটি শিশুর ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর অপেক্ষায় ছিল একটি পরিবার। হয়তো মা ভেবেছিলেন, একটু পরই ছেলে ফিরে আসবে। হয়তো বাবা অপেক্ষা করছিলেন দরজার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হয়েছে এমন এক খবরে, যা কোনো মা-বাবার জীবনে আসুক—এমনটা কেউই চায় না।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়্যাত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) আর ফিরবে না। নিখোঁজের প্রায় একদিন পর শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন পশ্চিম সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপ্রতিম ছিল কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল অপ্রতিম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। সন্ধ্যার পর স্বজনদের উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। পরে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি করেন। পরিবার ও স্থানীয়রা রাতভর তাকে খুঁজতে থাকেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রযুক্তিগত তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপ্রতিমের গতিবিধি অনুসরণের চেষ্টা করে। শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি লালমাই পাহাড়ঘেঁষা পশ্চিম সানন্দা এলাকার একটি নির্জন স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত শুরু করে। বিভিন্ন সংবাদসূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তুহিন, আনাস ও ফাহিম আহমেদ নামে তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হচ্ছে। তবে এখনো হত্যার প্রকৃত কারণ এবং কারা সরাসরি জড়িত—তা তদন্তাধীন।
অপ্রতিমের মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের পর শনিবার রাত ৮টার দিকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ ও ঘটনার বিস্তারিত আরও স্পষ্ট হবে।
অপ্রতিমের জন্য একদিন থামবে কুবি
একজন শিক্ষক মায়ের একমাত্র সন্তানকে হারানোর ঘটনায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সাধারণ শোক ঘোষণা করেছে। এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস ও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। স্থগিত পরীক্ষার নতুন সময়সূচি পরে সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার গভীরভাবে শোকাহত ও স্তব্ধ। কর্তৃপক্ষ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে।
আজ রোববার জানাজা, এরপর শেষ বিদায়
আজ রোববার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর সকাল ১১টায় কুমিল্লার গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে বলে পরিবার জানিয়েছে।
মাত্র ১৩ বছরের একটি জীবন। সামনে ছিল স্কুল, বন্ধু, স্বপ্ন আর অজস্র সম্ভাবনা। অথচ একটি বিকেলে মায়ের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হওয়া সেই শিশুটিই পরদিন ফিরল নিথর দেহ হয়ে।
অপ্রতিমের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়—এটি নিরাপত্তা, শিশু সুরক্ষা এবং অপরাধ তদন্তের সক্ষমতা নিয়ে সমাজের সামনে কঠিন প্রশ্নও রেখে গেছে। এখন সবচেয়ে বড় দাবি একটাই—ঘটনার প্রকৃত সত্য দ্রুত উদঘাটন হোক, নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত অপরাধীরা যেন আইনের আওতায় আসে।
একটি মায়ের বুক খালি হয়েছে। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ মুহূর্তেই বদলে গেছে। আর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশে নেমেছে শোকের নীরবতা—১৩ বছরের অপ্রতিমকে হারানোর শোক।
সূত্র: আমার দেশ, ঢাকা ট্রিবিউন, আজকের পত্রিকা, সমকাল ও অন্যান্য প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন; পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য।






