বেইজিং শিয়াংশান ফোরামে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ভাবনা তুলে ধরলেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা

উন্নয়নশীল দেশকে বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোতে আরও কার্যকর ভূমিকার আহ্বান।
টুইট প্রতিবেদক: বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকতর কার্যকর ভূমিকা, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি।
চীনের বেইজিংয়ে ১৫ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ১৩তম বেইজিং শিয়াংশান ফোরামের চতুর্থ প্লেনারি অধিবেশনে ‘The Role and Vision of Developing Countries’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তব্য দেন তিনি। এবারের ফোরামের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘Build Consensus on Stability, Advance Security Governance Together’। ফোরামে প্রায় ১০০টি দেশ, অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদল অংশ নেয়।
বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিবেশ সশস্ত্র সংঘাত, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জলবায়ুজনিত চাপের কারণে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো শুধু বৈশ্বিক নিরাপত্তা সিদ্ধান্তের অনুসারী নয়; আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনেও তাদের অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংলাপ, শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি, জাতীয় সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ–দক্ষিণ সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জোরদার, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন, অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব রয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই নীতির ভিত্তিতে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে পারস্পরিক সম্মান ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসান, রাজনৈতিক সমঝোতা, উন্নয়ন ও আস্থা তৈরির একটি কাঠামো তৈরি করেছে। তবে কিছু অনিষ্পন্ন বিরোধ, সশস্ত্র ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সীমান্তবর্তী এলাকার অস্থিতিশীলতা টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের পথে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সংলাপ, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন, স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক উন্নয়ন, আইনের শাসন এবং সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের কথা তুলে ধরেন তিনি।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়ে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলতি বছরের জুনের চীন সফর দুই দেশের ‘Comprehensive Strategic Cooperative Partnership’-এ নতুন গতি সঞ্চার করেছে। অবকাঠামো, যোগাযোগ, শিল্পায়ন, জ্বালানি, বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সবুজ উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে চীনের অবদানের বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন।
একই সঙ্গে বাজার সম্প্রসারণ, দায়িত্বশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খলে সহযোগিতা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনটি অগ্রাধিকারও তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক কূটনীতি, আগাম সতর্কীকরণ ও আঞ্চলিক সংকট ব্যবস্থাপনা জোরদার করা; সাইবার সহযোগিতা, উদীয়মান প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার, আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমন, জলবায়ু অভিযোজন ও দুর্যোগ প্রস্তুতির মাধ্যমে সম্মিলিত সহনশীলতা বৃদ্ধি; এবং সংঘাতপ্রবণ এলাকায় নিরাপত্তার পাশাপাশি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, জীবিকা, শিক্ষা, অবকাঠামো ও স্থানীয় আস্থা জোরদার করা।
বক্তব্যের পর অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এসব প্রশ্নের উত্তর দেন।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই ফোরামে বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। ফোরামের চারটি প্লেনারি অধিবেশনে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ও কৌশলগত স্থিতিশীলতা, স্থানীয় সংঘাত ও সমাধানের পথ, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়।






