গণতন্ত্রের পরীক্ষা এখন কথায় নয়, রাজনৈতিক আচরণে

ভিন্নমতকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ উল্লেখ করে রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সহনশীলতার আহ্বান; গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, খেলাপি ঋণ ও জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের তাগিদ; রাজ‌নৈ‌তিক কি বার্তা দি‌লেন প্রধানমন্ত্রী।

ব‌দিউল আলম লিংকন: গণতন্ত্রের পরীক্ষা এখন কথায় নয়, রাজনৈতিক আচরণে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান যে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন, তা নিছক একটি অধিবেশন শেষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

গণতন্ত্র, ভিন্নমত, রাজনৈতিক সহনশীলতা, জাতীয় ঐক্য এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে তাঁর বক্তব্যে বর্তমান রাজনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গণতন্ত্রে বিরোধিতা থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক শত্রুতে পরিণত করে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষের জন্যই নিরাপদ নয়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রাজনৈতিক বিভাজন যেন এমন পর্যায়ে না যায়, যেখানে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি আবারও মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়।

তবে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা বাস্তব রাজনৈতিক আচরণে প্রতিফলিত হবে। বিরোধী মতকে সহ্য করা, সমালোচনার জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখা—গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি সেখানেই।

বাকস্বাধীনতার প্রশ্নেও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি হলেও স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের সম্পর্ক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক বিতর্ক যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীনতা ও গালাগালিতে পরিণত না হয়—এটি শুধু রাজনীতিকদের নয়, পুরো সমাজের জন্যই একটি জরুরি বার্তা।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আরও বাস্তবমুখী আলোচনার দাবি রাখে। জ্বালানি সংকটকে কেবল সরকারের ব্যর্থতা কিংবা বিরোধী দলের আন্দোলনের বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা, আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি—সবকিছু মিলিয়েই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে সমাধানও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক।

এখানে বিরোধী দলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে প্রশ্ন করা বিরোধী দলের দায়িত্ব, কিন্তু জাতীয় সংকটের সময়ে কার্যকর বিকল্প প্রস্তাব দেওয়াও তাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব। একইভাবে সরকারেরও বিরোধী মতকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে প্রয়োজনীয় সহযোগী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

সৌরবিদ্যুতের ওপর গুরুত্বারোপের পরিকল্পনাও সময়োপযোগী

জ্বালানি নিরাপত্তা এখন কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও বহুমুখী জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা জরুরি।
খেলাপি ঋণের বোঝা কমানোর উদ্যোগ নিয়েও সরকারের বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব ফলাফলই হবে মূল বিবেচ্য। ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের দায়মুক্তির প্রবণতা বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। জাতীয় ঐক্যের ডাক তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় পক্ষই নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।

গণতন্ত্র রক্ষার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সংসদে দেওয়া বক্তব্যে নয়—রাজপথে, সংসদে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এবং রাজনৈতিক আচরণে। প্রধানমন্ত্রী যে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন, তার সাফল্য নির্ভর করবে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই সেই আহ্বানকে কতটা বাস্তব রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত করতে পারে তার ওপর।