ভারতের রুশ তেল কেনায় পশ্চিমা চাপ, তীব্র প্রতিবাদ রাশিয়ার

‘ভারতের যত তেল প্রয়োজন, সরবরাহে প্রস্তুত মস্কো’; নিষেধাজ্ঞাকে ‘চাপ প্রয়োগের কৌশল’ বললেন রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ।
নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারতের রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধে পশ্চিমা চাপ ও সম্ভাব্য শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের তীব্র সমালোচনা করেছে মস্কো। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভারতে ডেনিস আলিপভ বলেছেন, ভারত তার নিজস্ব জ্বালানি চাহিদা ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় রুশ তেল কিনছে। এ বাণিজ্য বন্ধে চাপ সৃষ্টি না করে পশ্চিমা দেশগুলোর উচিত ভারতের জন্য আরও ভালো দামের প্রস্তাব দেওয়া।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকার ও মন্তব্যে আলিপভ বলেন, রাশিয়া ভারতের জ্বালানি চাহিদা পূরণে যতটা তেল প্রয়োজন, ততটাই সরবরাহ করতে প্রস্তুত। পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ককে তিনি ‘চাপ প্রয়োগের কৌশল’ হিসেবে অভিহিত করেন।
আলিপভ বলেন, ভারত রাশিয়াকে সহায়তা করার জন্য তেল কিনছে না; নিজেদের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের জন্যই তেল আমদানি করছে। ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দেশটি নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা আগেও দেখিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভালো প্রস্তাব দিতে না পেরে চাপ
রুশ রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্দেশে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়েছে—ভারতকে রাশিয়ার চেয়ে ভালো দামে তেল সরবরাহে তাদের বাধা কোথায়? তাঁর যুক্তি, ভালো বাণিজ্যিক প্রস্তাব দিতে না পেরে পশ্চিমা দেশগুলো নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করছে।
আলিপভের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি সহযোগিতা পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাই তৃতীয় কোনো পক্ষের চাপ দিয়ে এ সম্পর্ক পরিবর্তন করা সহজ হবে না।
ভারতের রুশ তেল আমদানি এখনও বড়
পশ্চিমা চাপ সত্ত্বেও ভারত রাশিয়ার অন্যতম বড় জ্বালানি ক্রেতা হয়ে আছে। বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫০ দশমিক ৮৩ শতাংশ, অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ২৪ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল, রাশিয়া থেকে এসেছিল। এটি ওই সময়ের রেকর্ড পর্যায়ের আমদানি ছিল।
তবে আগস্টে রাশিয়া থেকে ভারতের আমদানি কমে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে। এতে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ প্রায় ৪৫ শতাংশে দাঁড়ায়। জুলাইয়ের প্রায় ২৮ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল দৈনিক আমদানির তুলনায় আগস্টের পরিমাণ প্রায় ২৬ শতাংশ কম।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পতনের পেছনে রাশিয়ার সরবরাহ ও শোধনাগার-সংক্রান্ত বিঘ্ন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, চীনের বাড়তি চাহিদা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপ—সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে।
কেন রাশিয়ার তেল ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক ও ভোক্তা। দেশটির পরিশোধনাগারগুলো বহু ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক সুবিধাজনক দামের সরবরাহ তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেলের ঐতিহ্যগত ইউরোপীয় বাজার সংকুচিত হলে ভারত ও চীন বড় ক্রেতা হিসেবে সামনে আসে। বিশেষ করে রাশিয়ার তুলনামূলক সস্তা অপরিশোধিত তেল ভারতীয় শোধনাগারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ উৎসে পরিণত হয়।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রুশ তেলের মূল্যছাড় আগের তুলনায় সংকুচিত হয়েছে। সেপ্টেম্বরে কিছু উরালস তেল বেঞ্চমার্ক ব্রেন্টের কাছাকাছি, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সামান্য বেশি দামে লেনদেনের তথ্যও এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি
ভারতের রুশ তেল কেনাকে ঘিরে ওয়াশিংটনের চাপের সবচেয়ে বড় উপাদান হচ্ছে সম্ভাব্য অতিরিক্ত শুল্ক। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে পাস হওয়া রাশিয়া ও ইরানবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা আইনের প্রস্তাবে রুশ জ্বালানির বড় ক্রেতা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার বিধান রয়েছে।
ভারত ও চীন এ ধরনের সম্ভাব্য ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। তবে আইনটি এখনো মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। গত আগস্টের শেষেও এ নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদে ভোটের সময়সূচি নির্ধারিত হয়নি।
এ কারণে ভারতের রুশ তেল আমদানি শুধু জ্বালানি বাজারের বিষয় নয়, বরং দিল্লি-ওয়াশিংটন বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
এবার রাশিয়াই ভারতের পেট্রোলের ক্রেতা
রুশ-ভারত জ্বালানি বাণিজ্যে এবার দেখা দিয়েছে এক অস্বাভাবিক পরিবর্তন। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বেশ কয়েকটি তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটিতে পেট্রোলের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে রাশিয়াকে ভারত থেকে পরিশোধিত পেট্রোল আমদানি করতে হচ্ছে।
জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, জুন ও জুলাইয়ে ভারত থেকে রাশিয়ায় ১০ লাখের বেশি ব্যারেল পেট্রোল পাঠানো হয়েছে। কেপলার তথ্য অনুযায়ী, জুনে দৈনিক প্রায় ১২ হাজার ব্যারেল এবং জুলাইয়ে প্রায় ২১ হাজার ব্যারেল পেট্রোল রাশিয়ায় গেছে।
সাম্প্রতিক আরেক হিসাব অনুযায়ী, জুন-জুলাইয়ে ভারত থেকে রাশিয়ায় মোট প্রায় ১৬ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল পেট্রোল গেছে। এই প্রবাহের বড় অংশ এসেছে ভারতের গুজরাটের ভাদিনার শোধনাগার থেকে।
অর্থাৎ একদিকে রাশিয়া বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ভারতকে দিচ্ছে, অন্যদিকে ইউক্রেনীয় হামলায় রাশিয়ার নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারতীয় পরিশোধিত জ্বালানিও রাশিয়ায় যাচ্ছে। এতে দুই দেশের জ্বালানি বাণিজ্যে এক ধরনের ‘উল্টো প্রবাহ’ তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার শোধনাগারে চাপ
ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে রাশিয়ার জ্বালানি তেল রপ্তানি ২০১৭ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে এবং দেশটির শোধনাগারগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাকও চলতি বছরের তেল উৎপাদন পূর্বাভাস কমার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শোধনাগারগুলোতে অনিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সাময়িক সমস্যার কারণে উৎপাদনে আংশিক পতন হয়েছে।
সামনে কী?
ভারতের জন্য রুশ তেল এখনো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ উৎস হলেও পরিস্থিতি আগের মতো সরল নেই। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা ও সম্ভাব্য শুল্কের চাপ, অন্যদিকে চীনের বাড়তি রুশ তেল কেনা এবং রাশিয়ার নিজস্ব উৎপাদন ও শোধনাগার-সংক্রান্ত সংকট—সব মিলিয়ে ভারতের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
তবে মস্কোর অবস্থান স্পষ্ট—পশ্চিমা চাপ সত্ত্বেও ভারত চাইলে রাশিয়া তার প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সরবরাহ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। আর নয়াদিল্লিও এখন পর্যন্ত রুশ তেল কেনাকে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের অংশ হিসেবে দেখছে।
ফলে রাশিয়া-ভারত তেল বাণিজ্য আগামী দিনগুলোতে শুধু দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয় থাকবে না; এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।






