পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ভিজ্যুয়ালে তুরস্কের কোরকুট, বাড়ছে ড্রোন প্রতিরোধ সক্ষমতা

পিএএফের ‘ফিজাওঁ কে পাসবান’ ভিডিওতে দেখা গেল ৩৫ মিমি কোরকুট; ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল ও নিচু দিয়ে উড়া লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহারের উপযোগী এই ব্যবস্থা।
নিজস্ব প্রতিবেদক: পাকিস্তান বিমানবাহিনীর (পিএএফ) সাম্প্রতিক একটি সরকারি ভিডিওতে তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান আসেলসানের তৈরি কোরকুট ৩৫ মিমি স্বল্প-পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখা গেছে। পাকিস্তানের জাতীয় প্রতিরক্ষা দিবসকে ঘিরে প্রকাশিত ‘ফিজাওঁ কে পাসবান’ শিরোনামের ভিডিওতে ব্যবস্থাটির উপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক একটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এটিকে পাকিস্তানের স্বল্প-পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা কাঠামোয় কোরকুটের অন্তর্ভুক্তির সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পাকিস্তান বিমানবাহিনী এখন পর্যন্ত কোরকুটের সংখ্যা, ক্রয়চুক্তি, সরবরাহের সময়সূচি বা নির্দিষ্ট মোতায়েনস্থল সম্পর্কে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেনি। ফলে ভিডিওতে উপস্থিতির ভিত্তিতে পাকিস্তানের কাছে কতটি ব্যবস্থা রয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
৩৫ মিমির জোড়া কামান
কোরকুট একটি স্বচালিত স্বল্প-পাল্লার বিমানবিধ্বংসী কামান ব্যবস্থা। আসেলসানের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, কোরকুট ১৫০/৩৫ ব্যবস্থায় দুটি ৩৫ মিমি কামান রয়েছে এবং এর সর্বোচ্চ গোলাবর্ষণের হার প্রতি মিনিটে প্রায় ১ হাজার ১০০ রাউন্ড। কার্যকর পাল্লা প্রায় ৪ কিলোমিটার। ব্যবস্থাটিতে ২০০ রাউন্ড প্রস্তুত গোলাবারুদ বহনের সক্ষমতাও রয়েছে।
কোরকুটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো চলন্ত অবস্থায় গুলি ছোড়ার সক্ষমতাসম্পন্ন স্থিতিশীল কামান টাওয়ার। এতে লক্ষ্য অনুসরণের জন্য আগুন নিয়ন্ত্রণ রাডার ও তড়িৎ-অপটিক্যাল সেন্সর রয়েছে। ফলে দ্রুতগতির ও নিচু উচ্চতায় উড়তে থাকা লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্য অনুসরণ ও আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়ে।
এক ইউনিটে তিন কামান, একটি নিয়ন্ত্রণযান
আসেলসানের তথ্য অনুযায়ী, কোরকুট সাধারণত একটি প্লাটুন কাঠামোয় পরিচালিত হয়। এতে থাকে তিনটি অস্ত্র ব্যবস্থা যান এবং একটি কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ যান। নিয়ন্ত্রণযানে ত্রিমাত্রিক অনুসন্ধান রাডার থাকে, যা লক্ষ্য শনাক্ত, শ্রেণিবিন্যাস ও অনুসরণ করতে পারে। একই সঙ্গে এটি স্থানীয় আকাশ পরিস্থিতির চিত্র তৈরি করে হুমকি মূল্যায়ন এবং কোন অস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তুকে মোকাবিলা করা হবে, তা নির্ধারণে সহায়তা করে।
অস্ত্র ব্যবস্থা যানগুলোতে রয়েছে ৩৫ মিমির জোড়া কামান, উন্নত আগুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং তড়িৎ-অপটিক্যাল সেন্সর। এতে বন্ধু ও শত্রু শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও সমন্বিত করা যায়।
ড্রোন মোকাবিলায় বিশেষ গুরুত্ব
কোরকুটের বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো প্রোগ্রামযোগ্য বিস্ফোরণক্ষম ৩৫ মিমি গোলাবারুদ ব্যবহারের সক্ষমতা। আসেলসান এটিকে ‘এটম ৩৫ এবিএম’ এবং অধিকসংখ্যক ধ্বংসাত্মক কণা ব্যবহারের উন্নত সংস্করণ ‘এটম ৩৫ আইএবিএম’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এসব গোলাবারুদ লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি আকাশে বিস্ফোরিত হয়ে ধাতব কণার ঘন মেঘ তৈরি করে।
এই প্রযুক্তির কারণে কোরকুট শুধু যুদ্ধবিমান বা হেলিকপ্টারের বিরুদ্ধে নয়, মানববিহীন আকাশযান, ড্রোনের ঝাঁক, ক্রুজ মিসাইল এবং আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মতো নিচু উচ্চতার হুমকির বিরুদ্ধেও ব্যবহারের উপযোগী। আসেলসান নিজেই এসব লক্ষ্যকে কোরকুটের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রেখেছে।
পাকিস্তান-তুরস্ক প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নতুন ইঙ্গিত
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ভিজ্যুয়ালে কোরকুটের উপস্থিতি দুই দেশের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আরেকটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তুরস্ক গত কয়েক বছরে স্বল্প-পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ও ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি করেছে। আসেলসানের কোরকুট ব্যবস্থার উৎপাদন ও সরবরাহও অব্যাহত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে কোরকুট ১৫০/৩৫-এর ধারাবাহিক উৎপাদন ও সরবরাহ চলার কথা বলা হয়েছে।
এরই মধ্যে ২০২৬ সালে আসেলসান নতুন কোরকুট ১৪০/৩৫ সংস্করণও সামনে এনেছে, যা ৮×৮ কৌশলগত চাকাযুক্ত যানভিত্তিক। এতে ৩৫ মিমির জোড়া কামান, রাডার, তড়িৎ-অপটিক্যাল সেন্সর এবং এটম সিরিজের প্রোগ্রামযোগ্য গোলাবারুদ ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে।
পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষায় সম্ভাব্য ভূমিকা
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে তুলনামূলক কম খরচে ব্যবহৃত ড্রোন, ঘুরে বেড়ানো গোলাবারুদ এবং নিচু দিয়ে উড়া ক্রুজ মিসাইলের বিস্তার স্বল্প-পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষাকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে। এ ধরনের হুমকির বিরুদ্ধে কেবল দীর্ঘ-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার অর্থনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে। সেখানে রাডারনির্ভর ৩৫ মিমি কামান ও প্রোগ্রামযোগ্য বিস্ফোরণক্ষম গোলাবারুদ কার্যকর স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা দিতে পারে।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ভিজ্যুয়ালে কোরকুটের উপস্থিতি তাই দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তুর্কি প্রযুক্তির সম্ভাব্য সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এটি এখনই পাকিস্তানের কোরকুট সংগ্রহের সংখ্যা, চুক্তির মূল্য বা পূর্ণাঙ্গ মোতায়েনের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তথ্যটি বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।






