বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইইউর নতুন বার্তা, বাড়ছে নজরদারি

সুশাসন, আইনের শাসন ও বিচার সংস্কারের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে গুরুত্ব।
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর ও বিস্তৃত করার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সুশাসন শক্তিশালীকরণ, আইনের শাসন, বিচার বিভাগীয় সংস্কার, টেকসই বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সংস্থাটি।
সম্প্রতি ঢাকায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রদ্রিগেসের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। বৈঠকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, সংস্কার কার্যক্রম এবং দুই পক্ষের অংশীদারত্ব আরও কার্যকর করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
ইইউ জানিয়েছে, বাংলাদেশের শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিচার সংস্কারের পথে তারা সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশে পৌঁছে দিতে কাজ করবে।
সুশাসন ও বিচার সংস্কারে সহযোগিতা
বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন, বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা বাড়ানো ইইউর সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। গ্রাম আদালত শক্তিশালীকরণ, আইনি সহায়তা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তরেও সংস্থাটি বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা করছে।
নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও ইইউর আগ্রহ রয়েছে। ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করতে ১৯টি সুপারিশ করেছে।
এ ছাড়া পুলিশ ও নিরাপত্তা খাতের সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন এবং মানবপাচার প্রতিরোধ নিয়েও বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সুযোগ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইউরোপীয় বাজারে বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো এখন দুই পক্ষের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাম্প্রতিক আলোচনায় বাংলাদেশ ও ইইউ বাণিজ্যে বিদ্যমান ৬১টি অশুল্ক বাধার মধ্যে ৪৮টি সমাধান হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বাকি বাধাগুলো দূর করার কাজও চলছে। পাশাপাশি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বিনিয়োগ সুরক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নেওয়ায় ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি সুবিধা, বিনিয়োগ এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও টেকসই উন্নয়নে অংশীদারত্ব
ইইউ বাংলাদেশের সবুজ অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু সহনশীলতা, শ্রম অধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে ৩০৬ মিলিয়ন ইউরো অনুদান দিয়েছে ইইউ। ২০২৫ থেকে ২০২৭ সময়ের জন্য আরও ১৬৪ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা নির্ধারিত হয়েছে।
‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ উদ্যোগের আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, টেকসই পরিবহন ও পানি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
সম্পর্কের নতুন কাঠামো
বাংলাদেশ–ইইউ সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও বিস্তৃত করতে ব্যাপক অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মানবাধিকার, জলবায়ু, অভিবাসন ও সুশাসনের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ফলে মাইকেল মিলার ও স্টিফেন রদ্রিগেসের সাম্প্রতিক বৈঠককে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত সহযোগিতা জোরদারের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সুশাসন ও আইনের শাসন থেকে শুরু করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সবুজ অর্থনীতি—বহুমাত্রিক এই সহযোগিতা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ–ইইউ সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ ও কার্যকর করার পথ তৈরি করতে পারে।






