‘তেলাপোকা’ থেকে প্রতিরোধের প্রতীক?

তরুণদের ক্ষোভে ভারতে আলোচনায় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, মোদি সরকারের জন্য নতুন বার্তা
টুইট প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মধ্য থেকে জন্ম নেওয়া একটি অনলাইন উদ্যোগ এখন ভারতের তরুণ সমাজের ক্ষোভ ও হতাশার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে পরিচিত এই আন্দোলনকে ঘিরে রাজধানী দিল্লিতে হাজারো তরুণের সমাবেশ নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শনিবার দলটির প্রথম প্রকাশ্য বিক্ষোভে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণ-তরুণীরা রাজধানীতে জড়ো হন। তাদের দাবি,শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সরকারি জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, বিশেষভাবে দেশে ফিরে এই কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। সমাবেশে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনদের চোখে তারা হয়তো ‘তেলাপোকা’, কিন্তু নিজেদের অধিকার আদায়ে তারা সংগঠিত হতে প্রস্তুত।
একটি মন্তব্য থেকে আন্দোলনের সূচনা
সম্প্রতি ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে। বেকার তরুণদের ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে,এমন অভিযোগ সামনে আসে। ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিজিৎ দীপকে প্রশ্ন তোলেন, ‘সব তেলাপোকা একসঙ্গে বেরিয়ে এলে কী হবে?’
ব্যঙ্গাত্মক সেই পোস্ট অল্প সময়েই ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরে তিনি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। এর মূল স্লোগান ছিল,‘যাদের হিসাবের বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছে, তাদের জন্য একটি রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর।’
তরুণদের হতাশা আন্দোলনের জ্বালানি
বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে ভারতের তরুণ সমাজের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। উচ্চশিক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও চাকরির বাজার নিয়ে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ২৫ বছরের নিচের বহু শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের সমস্যায় ভুগছেন। একই সঙ্গে সরকারি চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপও বেড়েছে।
দিল্লির এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। তাদের দাবি, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে যুবসমাজের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ
ভারতের চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ে ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক অনিয়ম আন্দোলনের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। সীমিত সংখ্যক আসনের বিপরীতে লাখো শিক্ষার্থীর প্রতিযোগিতা, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষা পুনরায় আয়োজনের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের অন্যতম দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং পরীক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার।
সমাবেশে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পরও পরীক্ষায় অনিয়মের শিকার হতে হচ্ছে। অথচ চাকরির নিশ্চয়তা নেই। ফলে পুরো ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।
অনলাইন জনপ্রিয়তা কি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে?
যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিজেপির জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও এটি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারবে কি না, সে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করেন, দিল্লির সমাবেশ তরুণদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সচেতনতার ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, অনলাইনের বিপুল সমর্থনকে মাঠের রাজনীতিতে রূপান্তর করা সহজ হবে না।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট,ভারতের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের জমে থাকা ক্ষোভ এখন নতুন ভাষা ও নতুন প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। ‘তেলাপোকা’ শব্দটিকেই প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করে তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে নতুন বার্তা ছুড়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষণ
ভারতের রাজনীতিতে তরুণদের অসন্তোষ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা, বেকারত্ব এবং সুযোগের বৈষম্য নিয়ে যে ক্ষোভ জমেছে, সিজেপি সেই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হোক বা না হোক, এটি স্পষ্ট করেছে যে দেশের বিপুল যুবসমাজ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার ও সংগঠিত হতে শুরু করেছে।






