স্বাস্থ্য বাজেটে জোর প্রাথমিক সেবায়

বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি কম খরচে চিকিৎসা নিশ্চিতের তাগিদ

টুইট প্রতিবেদক: দেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেও তা যেন সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও কম ব্যয়বহুল চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারে,সেই আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণ সংশ্লিষ্ট বক্তারা। তারা বলেছেন, চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ প্রতিরোধমূলক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

একইসঙ্গে বহুখাতভিত্তিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ‘ওয়ান হেলথ’ কাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) সন্ধ্যায় “বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ” শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানের তৃতীয় অধিবেশনে এসব বক্তব্য উঠে আসে।

“স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা” শিরোনামের এ সেশনে সভাপতিত্ব করেন আরিফুল ইসলাম আদিব এবং সঞ্চালনা করেন নাভিদ নওরোজ।

আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারওয়ার তুষার, ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ডা. জাহিদুল বারী এবং জাতীয় প্রতিবন্ধী নাগরিক শক্তির নির্বাহী সদস্য আমজাদ হোসেন।

নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় উদ্বেগজনক’

ড. রুমানা হক বলেন, দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের প্রায় ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। তার মতে, এত সীমিত বিনিয়োগে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তিনি জানান, বাংলাদেশে ব্যক্তিগত চিকিৎসাব্যয়ের হার প্রায় ৭৯ শতাংশ, যেখানে ভারতে এ হার ৪৪ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে মাত্র ১০ শতাংশ। ফলে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় চাপ বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

ড. রুমানা আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকলেও তা যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে না। সংশোধিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে আনা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অডিট-ভীতির কারণে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়।

পাশাপাশি ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনেই প্রায় ৪৮ হাজার পদ শূন্য রয়েছে।

তার ভাষায়, “প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ প্রতিরোধমূলক খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা ও সমন্বিত স্বাস্থ্য কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।”

বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনা

সারওয়ার তুষার বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের বড় অংশ পরিচালন ব্যয়ে চলে যাচ্ছে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, বাজেট সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য দূর করার পরিবর্তে বৈষম্য বাড়াচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ঋণ ও বিনিয়োগ পরিস্থিতিতেও নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এনবিআর সংস্কার ও ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক আস্থাও কমছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ফ্যামিলি কার্ড’ হতে পারে সমাধান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরি হয়েছে। সরকারপ্রধান জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের যে আগ্রহ দেখিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে কার্যকর কৌশল প্রয়োজন।

তিনি মনে করেন, সরকারের চালু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবার ব্যয় ও সুবিধা নির্ধারণ করা গেলে স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা বাড়বে।

তার প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে বছরে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার স্বাস্থ্যসুবিধা নির্ধারণ করা গেলে সাধারণ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা গ্রহণে সক্ষম হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে সরকারি হাসপাতালের অবদান মাত্র ১২ থেকে ১৪ শতাংশ। তাই সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকর করতে বিকল্প তহবিল গঠন ও উদ্ভাবনী অর্থায়নের দিকেও নজর দিতে হবে।

‘তথ্য সংকটে বাস্তবসম্মত বাজেট হয় না’

সভাপতির বক্তব্যে আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, দেশে বাজেট প্রণয়নের সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ নিয়ে যে আলোচনা হয়, সেখানে মোট বাজেটের শতাংশ ও জিডিপির শতাংশকে প্রায়ই এক করে দেখা হয়, যা বিভ্রান্তিকর।

তিনি বলেন, “স্বাস্থ্যখাতে বড় বরাদ্দের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।”