তারাগঞ্জে শিক্ষা প্রশাসন নিয়ে প্রশ্ন

অধ্যক্ষ রফিকুলকে রক্ষায় সক্রিয় থাকার অভিযোগ শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিনের বিরুদ্ধে
টুইট ডেস্ক: রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ডাঙ্গিরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ও পতিত আওয়ামী লীগের সাবেক উপজেলা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা নিয়োগ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের তদন্ত শেষ হলেও পুরো ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিনুর ইসলাম শাহিন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তিনি তদন্ত প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার পরিবর্তে শুরু থেকেই অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এমনকি তদন্ত ধামাচাপা দিতে বিভিন্ন মহলে তদবির চালানোর অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত চলাকালে শাহিনুর ইসলাম শাহিন একাধিকবার রংপুর শহরে অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলামের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, তিনি বিভিন্ন মহলে “সব ম্যানেজ হয়ে যাবে” বলে আশ্বাস দিয়ে অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে সাহস জুগিয়েছেন।
এছাড়া অধ্যক্ষের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে তাকে কলেজে নিয়ে এসে প্রকাশ্যে অবস্থান করানোর ঘটনাও এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, তদন্ত শুরুর পর থেকেই শাহিনুর ইসলাম শাহিনের আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। অভিযোগকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা না করে বরং অভিযুক্ত পক্ষের হয়ে অবস্থান নেওয়ায় তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২ এপ্রিল তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে। কমিটির সদস্যরা হলেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল হালিম (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত), সমাজসেবা কর্মকর্তা এস. এম. মাহমুদুল হক এবং হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ঋষিকেশ রায়।
এর আগে গত ৪ জানুয়ারি কলেজটির কয়েকজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও গভর্নিং বডির সভাপতি মো. মোনাব্বর হোসেনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে বলা হয়, অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, উপবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও টিউশন ফি আদায় করা হয়েছে। পরীক্ষার ফরম পূরণ ও ক্লাসে অংশগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের এইচএসসি ব্যাচের অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থীকে মডেল টেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে অকৃতকার্য দেখিয়ে পরে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
এছাড়া কলেজের ডিজিটাল ল্যাব ও বিজ্ঞানাগার দীর্ঘদিন অচল থাকলেও উন্নয়নের নামে বরাদ্দকৃত অর্থের দৃশ্যমান ব্যবহার না থাকার অভিযোগ উঠেছে। ভর্তি কার্যক্রমেও বোর্ড নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক যোগসাজশের কারণেই দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আর সেই যোগসাজশের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিনুর ইসলাম শাহিনের নাম উঠে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাহিনুর ইসলাম শাহিন দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তারাগঞ্জ উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন। স্থানীয়দের মতে, একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করায় তিনি একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক বলয় গড়ে তুলেছেন, যা এখন তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগ দায়েরের পর দীর্ঘ সময় তদন্ত ঝুলে থাকায় জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে এবং সময়ক্ষেপণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মহলে তদবির চালানো হয়। এ সময় অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম গত ১১ জানুয়ারি থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ছুটিতে ছিলেন, যা অনেকেই “তদন্ত এড়ানোর কৌশল” হিসেবে দেখছেন।
পরবর্তীতে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরের নির্দেশে তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করা হয়।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোনাব্বর হোসেন বলেন, “অডিট প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পর্যালোচনা শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।”
অন্যদিকে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিনুর ইসলাম শাহিন বলেন, “এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না।”
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত না হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দুর্বল হতে পারে।






